সোসাইটিনিউজ ডেস্ক:
আখ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য অর্থকরী ফসল এবং চিনি ও গুড় উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। চিবিয়ে খাওয়া, রস প্রস্তুত এবং সিরাপ তৈরির জন্যও দেশে আখের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।  পৃথিবীর অন্যান্য আখ উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে একরপ্রতি আখের ফলন খুবই কম। বাংলাদেশে একরপ্রতি আখের ফলন মাত্র ১৮.৫ মেট্রিক টন। আমাদের পাশের দেশ ভারতে একরপ্রতি আখের ফলন ২৮ মেট্রিক টন, ব্রাজিলে ৩২ টন, অস্ট্রেলিয়ায় ৩৫ টন এবং কলম্বিয়ায় ৪০ টন। বাংলাদেশের মিলজোন এলাকায় কোনো কোনো প্রগতিশীল চাষির জমিতে একরপ্রতি ৬০ মেট্রিক টন আখ ফলানোর সফল দৃষ্টান্ত রয়েছে।

উন্নত পদ্ধতিতে নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলো চাষের মাধ্যমে বাংলাদেশে একরপ্রতি আখের ফলন ৩০-৪০ টনে বৃদ্ধি করা সম্ভব। আখ চাষের উন্নত কলাকৌশলগুলোর মধ্যে আগাম আখ চাষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে আগাম আখ চাষের উপযুক্ত সময় হলো- অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময় অধিকাংশ জমিতে আমন ধান থাকার কারণে চাষিরা ইচ্ছে করলেও আগাম আখ চাষ করতে পারেন না। তাই আগাম আখ চাষের জন্য চাষি ভাইদের আমন মৌসুমে বিনা-৭, ব্রিধান-৩৩ প্রভৃতি আগাম জাতের ধান চাষ করতে হবে। এসব ধান অক্টোবর মাসের শেষদিকে কাটার পর অনায়াসে নভেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বরে আগাম আখের চাষ করা যায়।

শুধু আগাম আখ চাষের মাধ্যমে আখের ফলন শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ বৃদ্ধি করা যায়। এছাড়া আগাম রোপণ করা আখের গুণগতমান ভালো থাকে এবং চিনি ও গুড় আহরণ হারও বেশি হয়।

  • আগাম আখ চাষের সুবিধা :- ১। জমিতে প্রচুর রস থাকে ২। মাটিতে সন্তোষজনক তাপমাত্রা বিরাজ করে ৩। বীজের পরিমাণ কম লাগে ৪। ভালো অঙ্কুরোদগম হয় ৫। খরা ও বন্যা প্রতিরোধ করতে পারে ৬। অধিক কুশি গজায় ৭। জমিতে তেমন ফাঁকা জায়গা থাকে না ৮। পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয় ৯। সাথী ফসলের চাষ করা যায়। আগাম আখ রোপণের সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
  • জমি নির্বাচন :- দ্রুত বন্য বা বৃষ্টির পানি নেমে যায় এ ধরনের উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি আগাম আখ চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। আগাম আখ চাষের জন্য দোআঁশ মাটিই বেশি উপযোগী।
  • জাত নির্বাচন :- সফলভাবে আখ চাষের জন্য প্রথম প্রয়োজন একটি উন্নত ও উচ্চফলনশীল আখ জাত নির্বাচন। উঁচু জমির জন্য ঈশ্বরদী-১৬, ঈশ্বরদী-২৬, ঈশ্বরদী-৩২, ঈশ্বরদী-৩৩, ঈশ্বরদী-৩৫, ঈশ্বরদী-৩৬, ঈশ্বরদী-৩৭, ঈশ্বরদী-৩৮, ঈশ্বরদী-৩৯, ঈশ্বরদী-৪০ এবং মাঝারি উঁচু জমির জন্য ঈশ্বরদী-২০, ঈশ্বরদী-২১, ঈশ্বরদী-৩৪, জাতগুলো নির্বাচন করা উচিত।
  • জমি তৈরি :- আখ একটি দীর্ঘমেয়াদি, লম্বা ও ঘন শেকড়বিশিষ্ট ফসল। সে জন্য আখের জমি গভীর করে ৬ থেকে ৭টি চাষ ও মই দিয়ে ভালোভাবে তৈরি করতে হবে। জমি তৈরিকালে একরপ্রতি ৪ টন গোবর বা আর্বজনা সার প্রয়োগ করা উচিত।
  • নালা তৈরি :- ভালো ফলনের জন্য কোদাল দিয়ে ৮ থেকে নয় ইঞ্চি গভীর নালা তৈরি করতে হবে। এঁটেল-দোআঁশ মাটির জন্য নালা থেকে নালার দূরত্ব হবে ৩ ফুট ও বেলে-দোআঁশ মাটির জন্য নালা থেকে নালার দূরত্ব হবে ২.৫০ ফুট।
  • বীজ নির্বাচন :- আখের অধিক ফলনের জন্য অনুমোদিত জাতের সুস্থ-সবল, পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং রোগ ও পোকামাকড়মুক্ত প্রত্যায়িত বীজক্ষেতের আখ নির্বাচন করা উচিত। বীজের জন্য ৮ থেকে ৯ মাস বয়সের আখই বেশি উপযোগী। আখের বয়স বেশি হলে শুধু ওপরের অর্ধেক অংশ বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই শেকড় গজানো, চোখ ফোটা, রোগ ও পোকাআক্রান্ত আখ বীজ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
  • বীজ তৈরি ও শোধন :- আগাম আখ রোপণের জন্য ধারাল দা দিয়ে ২ চোখবিশিষ্ট বীজ খ- তৈরি করতে হবে। যে দা দিয়ে আখ বীজ কাটা হবে, তা মাঝে-মধ্যে আগুনে পুড়িয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। বীজ ও মাটির মধ্যে বিরাজমান রোগজীবাণুর হাত থেকে আখ বীজকে মুক্ত রাখার জন্য রোপণের আগে বীজ খ-গুলো ব্যভিস্টিন বা নোইন নামক ছত্রাক বারকের ০.১ শতাংশ দ্রবণে ৩০ মিনিট চুবিয়ে শোধন হবে।
  • নালায় সার প্রয়োগ :- ভালো ফলনের জন্য নালায় একরপ্রতি ৭২ কেজি টিএসপি, ৫৫ কেজি ইউরিয়া, ৫৩ পটাশ, ৫৬ কেজি জিপসাম, ২.৫ কেজি দস্তা ও ২০০ কেজি খৈল প্রয়োগ করে নালার ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি তলদেশ ভালোভাবে কুপিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে।
  • বীজ  রোপণ ও মাটিশোধন :- বীজ রোপণের সময় বীজ খ-ের চোখ দুই পাশে রাখতে হবে। বীজ খ-গুলো উইপোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য নালার মাটিতে বীজখ- স্থাপনের পর বীজখ-র ওপর দুই আঙুলের চিমটি দিয়ে একরপ্রতি ৬ কেজি পাইরিবেন-১৫ জি প্রয়োগ করে ২ ইঞ্চি গুঁড়া মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। লাল এবং বালিমিশ্রিত মাটিতে আখ রোপণের সঙ্গে সঙ্গে দোআঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে আখ রোপণের ৭ দিনের মধ্যে সেচ দিতে হবে এক্ষেত্রে পাইবেনের পরিবর্তে একরপ্রতি ৬.৬ কেজি রিজেন্ট ৩ জিআর ব্যবহার করতে হবে।
  • সাথী ফসলের চাষ :- আখ রোপণের পর বীজ থেকে চারা গজাতে এবং চারা বড় হতে ৩-৪ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। এ সময়ে দুই সারি আখের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় সারি করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, মুলা, গাজর, সরিষা, ছোলা, মসুর, তিসি, ধনে, পালংশাক , লালশাক, মরিচ ইত্যাদি স্বল্পমেয়াদি ফসলের চাষ করা যায়। এতে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং একই জমি থেকে একাধিক ফসলের চাষ করে চাষি অধিক লাভবান হন। এছাড়া সাথী ফসল থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে চাষিরা আখের বিভিন্ন পরিচর্যার কাজ করতে পারেন।
  • আন্তঃপরিচর্যা :- বীজ রোপণের পর থেকে ফসল কাটার আগ পর্যন্ত আখের জমিতে যেসব কাজ করা হয়, তার সবগুলোকেই আন্তঃপরিচর্যা বলে। আখের আন্তঃপরিচর্যাগুলো হলোÑ ফাঁকা জায়গা পূরণ, মাটি আলগা করে দেয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, সারের উপরি প্রয়োগ, আখের পাতা ও নাবী কুশি ব্যবস্থাপনা, চারার গোড়ায় মাটি দেয়া, সেচ ও পানি নিষ্কাশন এবং আখ বাঁধা।
  • ফাঁকা স্থান পূরণ :- আখ রোপণের ৩০ দিনের মধ্যে সাধারণত দুই ফুট দূরত্বের মধ্যে কোনো চারা না গজালে তাকে ফাঁকা স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে একই জাতের চারা বা বীজখ- দ্বারা ওই ফাঁকা স্থান পূরণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • মাটি আলগাকরণ :- ভারি বৃষ্টিপাত কিংবা সেচ দেয়ার পর জমিতে জো আসার সঙ্গে সঙ্গে মাটি অবশ্যই আলগা করে দিতে হবে।
  • আগাছা দমন :- আগাছা আখের সঙ্গে পানি ও খাবারের জন্য প্রতিযোগিতা করে। তাই রোপণের ১২০ দিন পর্যন্ত আখক্ষেত আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
  • সার ও কার্বোফুরান উপরি প্রয়োগ :- আখ রোপণের ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে একরপ্রতি ৫৫ কেজি ইউরিয়া, ৫২ কেজি পটাশ ও ১৬ কেজি কার্বোফুরান-৫জি আখের সারি থেকে ৬ ইঞ্চি দূরে লাঙল দিয়ে ভাউর টেনে ভাউরে উপরি প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। জমিতে রসের অভাব হলে সঙ্গে সঙ্গে সেচ প্রয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে। আখের পাতা ও নাবী কুশি।
  • ব্যবস্থাপনা :- নাবী কুশি ও পুরনো পাতা আখের ফলন ও চিনি আহরণ হার কমিয়ে দেয়। এ জন্য এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে এক থেকে দুইবার প্রতি ঝড়ে ৮ থেকে ১০টি পরিপুষ্ট কুশি রেখে অতিরিক্ত কুশিও পুরনো পাতা কেটে দিতে হবে। আখের গোড়ায়
  • মাটি দেয়া :- আগাম আখের ক্ষেতে ৮ থেকে ১০টি কুশি হওয়ার পর আখ গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে।
  • সেচ ও পানি নিষ্কাশন :- ফাল্গুন-চৈত্র মাসে কয়েক সপ্তাহ পর পর জমিতে দুই থেকে চারবার চার-পাঁচ একর/ইঞ্চি সেচ দিলে আখের ফলন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে আখের জমিতে জলাবদ্ধতা বৃষ্টি হলে আখক্ষেতে জমা পানি নালা কেটে দ্রুত বের করে দিতে হবে।
  • আখ বাঁধা :- ভাদ্র থেকে কার্তিক মাসে আখ যাতে ঝড়ো হাওয়ায় হেলে না পড়ে সে জন্য শুকনো পাতা দিয়ে প্রতিটি ঝাড় আলাদাভাবে এবং চারটি ঝাড় আড়াআড়িভাবে পিরামিড আকারে বেঁধে দিতে হবে।
  • আখ কাটা :- আখের বয়স ১২ থেকে ১৪ মাস হলে তা পরিপক্ব হয়। পরিপক্ব আখ ধারাল কোদাল দিয়ে মাটি সমতলে কাটা উচিত।
  • ফলন :- আগাম আখ চাষের মাধ্যমে অনায়াসে একরপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টন ফলন পাওয়া যায়। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।
    সূত্র: কৃষি প্রতিক্ষণ

LEAVE A REPLY