জয়নাল আবেদীন

সালটা ৪ নভেম্বর ১৯৪৮। বাংলা ও বাঙ্গালীর অধিকার আদায়ে এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের কথা মাথায় রেখে জন্ম নেয় একটি সংগঠন যার নাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। আওয়ামী লীগেরও আগে ছাত্রলীগের জন্ম। ছাত্রলীগ ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি এবং আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন।

ছাত্রলীগ আসলে যে পাকিস্তানি কলোনিয়াল শাসন-শোষণ, ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আজকের বাংলাদেশ পূর্ব বাংলা বলা হতো এই পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজকে স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্যে; স্বাধীনতা একটি শব্দ এবং মুক্তি আর একটি শব্দ। স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে জাতির জনক সৃষ্টি করেন উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ ছাত্র সংগঠন। তিনি অনেক দূরের স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন একজন লড়াকু নেতা। আমার কথা সেটা নয়, আপনারা সবাই ছাত্রলীগের অতীত ইতিহাস জানেন। বর্তমান সময়ে ছাত্রলীগ সবচেয়ে যে জায়গাটায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সেটা কলম সন্ত্রাসের জন্য। আজকে ছাত্রলীগ ভাল কাজ করলে যদি আপনারা সমান ভাবে কৃতিত্ব দিতেন তাহলে দুঃখ ছিলোনা।

১৯৪৮ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত হাজার হাজার ভাল কাজের জন্ম দিয়েছে এই ছাত্রলিগ।কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের ভাল কাজ গুলো আপনাদের মুখে ও কলমে স্থান পায়না। নেপালে ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়, অবকাটামো থেকে অর্থনীতি সবদিক দিয়ে ব্যাপক ক্ষতির স্বীকার হয় নেপাল। সেই দুঃসময়ে নেপালের মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কই তখনতো আপনারা আমাদের বাহবা দিলেন না?

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার অন্যতম একটি সাফল্য হচ্ছে ছিটমহল বিজয়। সেই ছিটমহলে আমাদের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে প্রায় পঞ্চাশ হাজার বৃক্ষ রোপণ করা হয়। সেটাও আপনারা বলবেননা।এবং সারা বাংলাদেশে এক সাথে ১০ লক্ষ বৃক্ষ রোপণ করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অনন্য রেকর্ড করবে ভবিষ্যতে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিটা ইউনিটে “ক্লিন ক্যাম্পাস, গ্রীন ক্যাম্পাস” কর্মসূচি হাতে নেয়।প্রতিটা মুজিব সেনা নিজেরা ঝাড়ু হাতে নিয়ে নিজেদের ক্যাম্পাস ও নিজ শহর পরিষ্কারে নেমে ছিলো। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গরীব ও মেধাবী এমনকি পথও শিশু যারা আছে তাদের লিখাপড়া জন্য এগিয়ে আসছে। হ্যাঁ আমাদেরও অনেক ভুল আছে,কতিপয় অনুপ্রবেশকারি আমাদের সংগঠনকে কুলশিত করার চেষ্টা বারংবার করেছে,যেহেতু এটা একটি বৃহৎ ছাত্র সংগঠন সেখানে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটবে। আর যে বা যারা এই অপকর্মে লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সাথে সাথে একশন নিতেও ভুল করছেনা। আমাদের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন ভাই নেতা হওয়ার পর পর বলেছিলেন ছাত্রলীগ মেধাবীদের সংগঠন আমরা মেধা নামক অস্ত্র ব্যাবহার করে বিশ্ব জয় করবো। তারই ধারাবাহিকতায় আপনারা এই কমিটিতে দেখছেন বিভিন্ন অপকর্মের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের কঠিন সিদ্ধান্ত গুলো। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ২টা দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে.(০১) সুশীল দ্বারা (০২) আমাদের দলীয় লোকজনের দ্বারা।

সুশীলরা প্রতিনিয়ত তাদের মুখ এবং কলম দিয়ে ছাত্রলীগের ক্ষতিতে লিপ্ত অন্যদিকে আমাদের দলীয় কিছু লোক বেফাঁস মন্তব্য করে ছাত্রলীগকে সবসময় বলির পাঠা বানাতে ব্যস্থ।বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম তার আক্ষেপের কথা বলেছিলেন কিভাবে ছাত্রলীগ কলম সন্ত্রাস আর দলীয় অতিলীগারদের দ্বারা আক্রোশের স্বীকার। তিনি বলেছিলেন “বাংলাদেশের এমন একটা জেলা কিংবা উপজেলা ইউনিটের নাম কেউ বলতে পারবেন যেখানে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন স্থানীয় এম.পি কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতার পছন্দের বাইরে কেউ করতে পেরেছিল কিংবা পারে । দোষ কিন্তু আবার তারা নেননা তখন দোষ হয় সংগঠনের । !!! গরীবের বউ সবার ভাবী !!! আসলেই বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এতিম হয়ে যায়।

আমরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আমাদের আছে সোনালী ইতিহাস।তখনকার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানি কাঠামোর মধ্যে বাঙালিদের অধিকার আন্দোলনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি পৃথক দেশের চিন্তা করেন নি। এ চিন্তাটা ছিল মওলানা ভাসানীর। কিন্তু এটাকে বাস্তবের রূপ দেওয়ার মতো কোনো সংগঠন গড়ে তোলা বা সেরকম ম্যাজিক লিডারশিপ তিনি দিতে পারেন নি। এটা হলো বাস্তবতা। তার কমিটমেন্টেও কোনো ঘাটতি ছিল না। স্বপ্নের মধ্যে কোনো ত্রুটি ছিল না। স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। স্বপ্ন অনেকেই দেখেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে সত্যি করা ভারি চ্যালেঞ্জিং। তখনকার কলোনিয়াল পিরিয়ড এক উপনিবেশবাদ থেকে আরেক উপনিবেশবাদ। ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান। সে সময় ছাত্রলীগের মতো একটা সংগঠনের প্রতিষ্ঠা এটা ছিল বঙ্গবন্ধুরই একটি লালিত স্বপ্নের সোনালি ফসল। এবং এই ছাত্রলীগই ১৯৪৮ সাল থেকে প্রথমেই বাংলা ভাষার দাবিতে ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে।

যখন শাসকদের মধ্য থেকে একেবারেই একটা বৈষম্যমূলক স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজের কথা বলা হলো উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা। তখন এর প্রতিবাদে পাকিস্তান সৃষ্টির উষালগ্ন থেকে ভাষা আন্দোলনের সূচনা। এর পুরোভাগে ছিল ভ্যানগার্ড ফোর্স ছিল ছাত্রলীগ।এরকম একটি বিষয় বিজয় দিয়েই ছাত্রলীগের যাত্রা শুরু। ’৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন সেখানেও ছাত্রলীগ একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। তারপর ’৫৮ সালের মার্শাল ল’ এই মার্শাল ল’-বিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও সাহসী। ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন ছাত্রলীগ, তখন ছাত্র ইউনিয়নও ছিল। ’৬২ সাল থেকেই ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন শিক্ষা আন্দোলনে একটা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তারপরে ’৬৬-র ৬-দফা আন্দোলন।এর পরের ধারাবাহিকতা ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন। সেই গণ-আন্দোলনে তো নেতৃত্বে ছিল সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। সেখানেও নেতৃত্বে ছিল ছাত্রলীগ। তারপর তো ’৭০-এর নির্বাচন বা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ।স্বাধীনতা থেকে স্বাধিকার এমনকি বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশ বি-নির্মাণে ছাত্রলীগ রাখছে অসামান্য অবধান। এত এত ভাল কাজ তারপরও ছাত্রলীগ আপনাদের মন যোগাতে পারেনা। কিন্তু কেন?

কারনটা সম্ভবত আমাদের এই রক্তজয়ী ইতিহাস আর সাহস। ছাত্রলীগকে দুর্বল করতে পারলেই আপনারা শেখ হাসিনাকে দুর্বল করতে পারবেন। আর শেখ হাসিনা দুর্বল হলে বাংলাদেশও হয়ে যাবে তলাবিহিন ঝুড়ি। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর ইয়াং ভার্সন হচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ | সময়ের সাহসী আর মেধাবী ছাত্ররাই ছাত্রলীগ করে | তাই ষড়যন্ত্র করে বাংলাদেশের অগ্রগতি কেউ আটকাতে পারেনি আর পারবেও না। আমরা মানুষ জাতি বড়ই বিচিত্র। সবসময় নিজেকে একজন পবিত্র মানুষ হিসেবেই উপস্থাপন করতে ভালোবাসি। আসলেইকি আমরা যার যার অবস্থান থেকে পবিত্র…? যারা নিজেকে পবিত্র দাবি করে তারা যতটা না পবিত্র তারচেয়ে বেশি অপবিত্র হয়ে থাকে। ।তাই যার যেটা প্রাপ্য তাকে সেটাই দেয়ার চেষ্টা করা উচিৎ। মনকে পবিত্র করুন, সৎ হোন, আর একবার চিন্তা করে দেখুন আপনি সুশীল সাজছেন যে দেশে থেকে সেই দেশ জন্ম দিয়েছে কারা। আমরা ছাত্রলীগ এই দেশের জন্মদাতা।

লেখক: স্কুল-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

LEAVE A REPLY