কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত প্রয়াণের চার বছর পূর্ণ হলো। ২০১২ সালের ১৬ নভেম্বর আমরা এই বরেণ্য চলচ্চিত্রকারকে হারাই। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের সমৃদ্ধিতে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

 

‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিটিতে কমেডি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পদার্পণ ছিল তার। সঙ্গত কারণে অনেকদিন ধরে দর্শক মনে কমেডিয়ান হিসাবেই জায়গা দখল করেছিলেন। যদিও ‘সুতরাং’ ছবিটির মাধ্যমে তিনি তার স্বরূপটি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সেই শুরুতেই।

 

ধুমধাড়াক্কা মারপিট ও উদ্ভট নাচ গানের কিছু নয়,  বাংলাদেশের মানুষের জীবনের গল্প সাদামাটা ভাষায় সাধারণ মানুষের জন্য তখন ফুটিয়ে তোলা হতো রূপালি পর্দায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সেই স্বর্ণযুগেরই  সফল কিংবদন্তি সুভাষ দত্ত। একজন দক্ষ অভিনেতা, চলচ্চিত্রের প্রযোজক, পরিচালক, সিনেমা চিত্রশিল্পী, চিত্রনাট্যকার ও শিল্প নির্দেশকএকসঙ্গে অনেকগুলো পরিচয় অর্জন করেছিলেন সুভাষ দত্ত।  এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তার সৃজনশীল কর্মের ঈর্ষণীয় সাফল্য। প্রচুর মঞ্চনাটকেও অভিনয় করেছেন তিনি।

 

তিনি ষাটের দশক থেকে বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ। তার কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল সিনেমার পোস্টার এঁকে। এ দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখওমুখোশ-এর পোস্টার ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন তিনি। মাটিরপাহাড় চলচ্চিত্রে আর্ট ডিরেকশনের মধ্যে দিয়ে তার পরিচালনা জীবন শুরু হয়। এরপর তিনি এহতেশাম পরিচালিত এদেশতোমারআমার  ছবিতে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পান। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র সুতরাং (১৯৬৪) এবং সর্বশেষ চলচ্চিত্র আমারছেলে (২০০৮)।

 

নিজের প্রথম পরিচালিত সুতরাং ছবির মাধ্যমে মিষ্টি হাসির কবরীকে তিনি ব্রেক দিয়েছিলেন।তার হাত ধরেই চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে  সুচন্দা, উজ্জল, শর্মিলী আহমেদ, ইলিয়াস কাঞ্চন, আহমেদ শরীফ ও মন্দিরার। শিল্পী গড়ার এক মহান কারিগর ছিলেন তিনি।

 

সুভাষ দত্তের জন্ম ১৯৩০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের মুনশিপাড়ায় মামার বাড়িতে। পৈতৃক বাড়ি বগুড়া জেলার চকরতি গ্রামে। বসবাস করতেন ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের নিজ বাড়িতে। স্ত্রী সীমা দত্ত ২০০১ সালের অক্টোবরে প্রয়াত হন। তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক।

 

সুভাষ দত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ও সুশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও চলচ্চিত্র নির্মাণের কৌশল শিখতে ভারতের বোম্বেতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে একটি ছায়াছবির পাবলিসিটির স্টুডিওতে মাত্র ত্রিশ টাকা মাসিক বেতনে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে ভারত থেকে ঢাকায় ফিরে যোগ দেন প্রচার সংস্থা এভারগ্রিন-এ। এরপর তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণ করেন চলচ্চিত্রের পোস্টার আঁকার কাজের মাধ্যমে।

 

১৯৫৭ সালে ভারতের হাইকমিশনের উদ্যোগে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে ওয়ারীতে। সেখানে দেখানো হয় সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী  চলচ্চিত্রটি। পথের পাঁচালী দেখেই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৬৩ সালের মে মাসে তিনি নির্মাণ শুরু করেন সুতরাং চলচ্চিত্রটি এবং ১৯৬৪ সালে এটি মুক্তি দেন। প্রধান অভিনেতা হিসেবে তিনি অভিনয় করেন সেই সময়কার নবাগতা অভিনেত্রী কবরীর বিপরীতে। এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সম্মাননা লাভ করেছিল।  ১৯৬৫ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট চলচ্চিত্র উৎসবে সুতরাং দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার লাভ করে।

 

এ ছাড়া মস্কো চলচ্চিত্র উৎসব (১৯৬৭, ১৯৭৩ ও ১৯৭৯) ও নমপেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (১৯৬৮) পুরস্কৃত হয়েছে সুভাষ দত্তের চলচ্চিত্র। ১৯৭৭ সালে ঘোষিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-এ তার প্রযোজনা-পরিচালনার বসুন্ধরা চলচ্চিত্রটির জন্য সেরা পরিচালক ও প্রযোজকসহ মোট পাঁচটি পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত একুশে পদকে ভূষিত হন।

 

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একবার আটক করে সুভাষ দত্তকে। তবে কয়েকটি উর্দু ছবিতেও অভিনয় করার কারণে তখন পাকিস্তানেও তিনি পরিচিত মুখ। সেই সুবাদে সেদিন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন তাকে ছেড়ে দিতে বলেন। এবং প্রাণে বেঁচে যান সুভাষ।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মাণ করেন অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, যাকে তার বানানো অন্যতম সেরা ছবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৭ সালে আলাউদ্দিন আল আজাদের বিখ্যাত উপন্যাস ২৩ নম্বর তৈলচিত্র অবলম্বনে বসুন্ধরা নামের যে চলচ্চিত্রটি সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেন- তা আজও চলচ্চিত্র সমালোচকদের আলোচনার বিষয়। সত্তর দশকের শেষের দিকে ড. আশরাফ সিদ্দিকীর লেখা গল্প গলির ধারের ছেলেটি অবলম্বনে তিনি নির্মাণ করছিলেন ডুমুরের ফুল চলচ্চিত্রটি।

 

অনেক চলচ্চিত্রের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে সুভাষ দত্তের নাম। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে- রাজধানীর বুকে, সূর্যস্নান, চান্দা, তালাশ, নতুন সুর, রূপবান, মিলন, নদী নারী, ভাইয়া, ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো, ক্যায়সে কাহু, আখেরি স্টেশন, সোনার কাজল, দুই দিগন্ত, সমাধান প্রভৃতি। তার নির্দেশিত উল্লেখযোগ্য  ছবির মধ্যে রয়েছে- সুতরাং, কাগজের নৌকা, আয়না অবশিষ্ট, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, আবির্ভাব, বলাকা মন, সবুজ সাথী, বসুন্ধরা, সকাল সন্ধ্যা, ডুমুরের ফুল, নাজমা, স্বামী স্ত্রী, আবদার, আগমন, শর্ত, সহধর্মিণী, সোহাগ মিলন, পালাবদল, আলিঙ্গন, বিনিময়, আকাঙ্ক্ষা, আমার ছেলে ইত্যাদি।

LEAVE A REPLY