ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আগামী ডিসেম্বরে দেশটিতে সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
নয়াদিল্লিতে তার দুই দিনের সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে এরই মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক ভারত সফর করেছেন। এদিকে আগামী ২৮ থেকে ৩০ নভেম্বর হাঙ্গেরীতে রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি পানি নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সামিটে অংশ নেবেন।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিসহ দু’দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত বিষয়গুলো সুরাহার পথ তৈরি হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব ভারতীয় সৈন্য শাহাদতবরণ করেছেন তাদের কয়েকজনকে সম্মাননা জানানো হবে। ঢাকা ও দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। তাই প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের এ বৈঠকের সুযোগ কাজে লাগানোরই পরামর্শ তাদের।
গত বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মোদি। যদিও এর মাঝে ব্রিকস্ বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফর করেছেন শেখ হাসিনা। তবে আসছে ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে ভারত সফরের কথা রয়েছে তা শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক কারণেই। তাই এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ এর মধ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট ঢাকা সফর করে বিপুল বিনিয়োগের কথা বলে গেছেন। এর ফলে বাংলাদেশের বিষয়ে নড়েচড়ে বসেছে ভারতের নীতি-নির্ধারকরা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীরের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে দু’দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের বিষয়টি আরেক ধাপ এগুবে বিশেষ করে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি।
সম্ভাব্য সূচি অনুযায়ী ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তিনদিনের সফরে ভারতে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরের মূল আলোচনার বিষয়বস্তু কী হবে তা এখনও চূড়ান্ত না হলেও কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ভারতের কাছে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার বিষয় হচ্ছে- পানি। এবারেও এই বিষয়েই গুরুত্ব দেয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, সর্বোচ্চ পর্যায়ের ওই বৈঠকের সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে নইলে বাংলাদেশের তার ন্যায্যতা পেতে আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি দু’দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক বাড়াতে হবে। আর এ কাজে দু’দেশের মধ্যে যাতায়াত, বিশেষ করে ভিসা জটিলতা দূর করার বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে।
তবে ডিসেম্বর মাসে ভারতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র দু’দিনের সফরে পারমাণবিক, মহাকাশ, উপগ্রহ, বাণিজ্য সহযোগিতাসহ ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার জোরদার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে দু’দেশের ভেতরে চুক্তি, প্রকল্পসহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা।
এবারের সফরে আরও একটি ঘটনা ঘটতে চলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যে সদস্যেরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের সম্মাননা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। জানা গেছে, দিল্লি সফরের সময়েই অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে প্রতীকীভাবে কয়েকজন নিহত সেনা পরিবারের সদস্যদের কাছে সম্মাননা তুলে দেবেন শেখ হাসিনা। যারা নিহত হয়েছেন, পর্যায়ক্রমে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদেরই এই সম্মাননা দেয়া হবে।
ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। তিনি এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মতো বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এবারের বিষয় হলো, ২০১০ সালের পর এই প্রথম তিনি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফরে যাচ্ছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরের সফর সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি খুব শিগগিরই বাংলাদেশে আসছেন। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সফর হবে। আমরা প্রতিরক্ষা খাতে অধিক যোগাযোগ ও বিনিময় করছি।
এদিকে ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কম সময়ের প্রস্তুতিতেই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঢাকায় আসছেন।
নয়া দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা বিশেষজ্ঞ শ্রীকান্ত কোন্দাপালির মতে, বেইজিংয়ের সামরিক সহযোগিতা এবং ঢাকায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাড়ায় দিল্লি উদ্বিগ্ন।
বিশেষ করে চীন থেকে ডিজেল-বিদ্যুৎচালিত দুটি সাবমেরিন কেনার বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ ঢাকা আমলেই নেয়নি, জানিয়েছেন বাংলাদেশের এক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং ভারত বিশেষজ্ঞ। চীন বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশকে তার যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনগুলোর ডক হিসেবে ব্যবহার করার আদর্শ স্থান মনে করতে পারে। আর এটা ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাবিদদের বেশ শঙ্কিত করছে।
আর এ কারণেই বাংলাদেশের ওপর ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবের পাল্টা হিসেবে এবার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ভারত। এজন্য আগামী ৩০ নভেম্বর, দুদিনের সফরে ঢাকা আসছেন ভারতের প্রতিরক্ষমন্ত্রী মনোহর পরিকর। এসময় তিনি বাংলাদেশের সাথে নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এর মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বৃদ্ধি যেমন থাকবে, তেমনই প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়ার এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে গভীর সহযোগিতা  আলোচ্যসূচিতে ঠাঁই পাবে। আর এ কারণেই এই সফর আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

LEAVE A REPLY