সুন্দরবনবিনাশী রামপালসহ সব প্রকল্প বাতিল না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। এরই অংশ হিসেবে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ওই প্রকল্প বাতিল না হলে ২৬ জানুয়ারি রাজধানীতে অর্ধদিবস হরতাল ও সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন কমিটির নেতারা।

গতকাল শনিবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতীয় কমিটির ডাকা মহাসমাবেশ থেকে এ ঘোষণা দিয়েছেন কমিটির নেতারা। রামপাল প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতির বিষয়ে সরকারকে জাতীয় কমিটি, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘ থেকে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, সরকার ক্ষতির কথা জেনেও সুন্দরবনে এই প্রকল্প করছে। এটা দেশবাসীকে জেনে-শুনে বিষপান করানোর মতো ব্যাপার। তাই দেশবাসীকে ওই বিষাক্ত প্রকল্প থেকে রক্ষা পেতে হলে সারা দেশে আরও কঠোর আন্দোলনের আহ্বান জানান তিনি।

সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সরকার রামপালের মতো সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্প করছে। আর বলছে, এসব উন্নয়নের জন্য হচ্ছে। এই উন্নয়ন ৯৯ জনকে বঞ্চিত করে একজনের উন্নয়ন। যারা দেশে লুটপাট করে টাকা বিদেশে পাচার করছে, তারাই এসব উন্নয়নের কথা বলছে। এসব উন্নয়নের মানে হচ্ছে গাইবান্ধায় সাঁওতালদের, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দুদের, রামু থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদের উন্নয়ন। তিনি বলেন, সুন্দরবন রক্ষার এই আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করার সংগ্রাম।

সভায় সাংবাদিক ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, আজকের এই বিশাল সমাবেশ দেখেও যদি সরকারের শিক্ষা না হয়, তাহলে সাহস থাকলে এই প্রকল্পের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট দিক। দেখুক জনগণ কী চায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রামপাল প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উন্মুক্ত বিতর্কের আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘সেখানে আপনিও থাকবেন, আমিও থাকব। দেশবাসী দেখুক কার পক্ষে যুক্তি বেশি।’ জনগণের ন্যায্য দাবি মানা না হলে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনকে রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের রাজনীতিতে পরিণত করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, রামপাল প্রকল্প নিয়ে সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি করছে। প্রকল্পে কোন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলছেন এক কথা; প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কোম্পানির কর্মকর্তা বলছেন আরেক কথা।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালিকুজ্জামান সরকারের উদ্দেশে বলেন, সরকার রামপালে যে উন্নয়নের কথা বলছে, তা বন উজাড় করার উন্নয়ন। নদীকে খাল, পাহাড় কেটে সমতল আর দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার উন্নয়ন। এসব উন্নয়ন না থামালে এমন আন্দোলন গড়ে তোলা হবে যে সরকার তা আর সামলাতে পারবে না বলে হুঁশিয়ার করেন তিনি।

গণসংহতি আন্দোলনের সভাপতি জোনায়েদ সাকি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, সময় থাকতে রামপাল প্রকল্প বাতিল করুন। নয়তো এই বিশাল জনস্রোত সরকারকে নাড়িয়ে দেবে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, দেশ এক সর্বগ্রাসী স্বৈরাচারের কবলে পড়েছে। এই স্বৈরাচারকে উৎখাত করতে না পারলে সুন্দরবন রক্ষা করা যাবে না। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বিনা ভোটের এই সরকার ভারতকে খুশি করতে রামপাল প্রকল্প করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি ডি রহমতউল্লাহ বলেন, সরকার যদি গায়ের জোরে রামপাল প্রকল্প করেও ফেলে, তাহলে একদিন না একদিন জনগণ তা ভেঙে দেবে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স ও গণসংহতি আন্দোলনের ফিরোজ আহমেদের সঞ্চালনায় মহাসমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় গণফ্রন্টের টিপু বিশ্বাস, বাসদের (মার্কসবাদী) শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, সংগীতশিল্পী কফিল আহমেদ। সংহতি জানান সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক সুলতানা কামাল, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের শরিফ জামিল, অর্থনীতিবিদ স্বপন আদনান, নৃবিজ্ঞানী রেহনুমা আহমেদ, নারায়ণগঞ্জের ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক গীতি আরা নাসরিন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

কর্মসূচি: সমাবেশ শেষে কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ পাঁচটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আগামী ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবস সুন্দরবন রক্ষায় এবং রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে পালন করবে জাতীয় কমিটি। দেশবাসীকেও এ দুটি দিবস এভাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। ২৬ ডিসেম্বর ঢাকাসহ সারা দেশে সমাবেশ পালন করার মধ্য দিয়ে দাবি দিবস পালন করা হবে।

বিভিন্ন দেশে সুন্দরবন রক্ষার এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে—এ কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ভারতের ৪৩টি সংগঠন রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে সমর্থন দিয়েছে। ৭ জানুয়ারি বিশ্ব প্রতিবাদ দিবস পালিত হবে। ভারত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই প্রতিবাদ দিবস পালিত হবে। ১৪ জানুয়ারি রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে কীভাবে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে। দেশের বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই পরিকল্পনা তৈরি করেছেন বলে আনু মুহাম্মদ উল্লেখ করেন। এরপরও যদি সরকার এই প্রকল্প বাতিল না করে, তাহলে ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় অর্ধদিবস সর্বাত্মক ধর্মঘট ও হরতাল কর্মসূচি পালন করা হবে।

বেলা পৌনে পাঁচটার দিকে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সমাবেশ শেষ হয়। সমাবেশ শেষে জাতীয় কমিটির ব্যানারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে একটি মিছিল শুরু হয়। মিছিলে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র-বিরোধী বিভিন্ন স্লোগানের পাশাপাশি জাতীয় কমিটি ঘোষিত আগামী ২৬ জানুয়ারির হরতালের সমর্থনে বিভিন্ন স্লোগান দেন হাজারো জনতা। শহীদ মিনার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র পর্যন্ত দীর্ঘ প্রতিবাদমুখর মিছিলটি শাহবাগ ও মৎস্য ভবন মোড় ঘুরে জাতীয় প্রেসক্লাব-সংলগ্ন কদম ফোয়ারার সামনে গিয়ে শেষ হয়।

LEAVE A REPLY