ঈদ-উল-আজহার দিন বিকাল বেলা এক ভদ্রলোকের দাওয়াত পেয়েছিলাম । আমার এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে ওই ভদ্রলোকের বাড়িতে গিয়ে জানতে পারলাম তার সন্তানের দুই পা হঠাৎ করেই প্যারালাইজড হয়ে যায়। সেই সাথে সে তার কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলে। কথাগুলো বলতেই তিনি কেঁদে ফেললেন।

বালকটির নাম সুমন। আমি সুমনের দিকে দৃষ্টি ফেরালাম। তার চোখের ভাষা বুঝার চেষ্টা করলাম। আমার মনে হলো তার অপলক দৃষ্টি বলছিল, আমি তোমাদের মতই মানুষ। তোমরা যেমন মহান আল্লাহর সেরা সৃষ্টি ঠিক তেমনি আমিও আল্লাহর সৃষ্টি। আমি তোমাদের মত চলাফেরা করতে পারি না। খেলাধুলা করতে পারি না। তোমাদের মত মনের আবদার গুলোও আব্বু-আম্মুর কাছে জানাতে পারি না। আব্বু-আম্মু তো আর শত ইচ্ছা করেও আমার আকুতি বুঝতে পারে না। তবুও তারা আমার ইচ্ছাগুলো পূরণের ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকেন। আমার কাছে কেউ আসতে চায় না ।

যারা আসে তাদেরকে দেখে আমার ভাল লাগে। তাদের মতো আমারও ঘুরতে, খেলতে ও স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আমি তো আর পারি না। সবার মত আমারও স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ডাক্তার হব। দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করব।

আমাদের আশেপাশে আরও অনেক সুমন রয়েছে যাদের খোঁজ আমরা পাই না। সুমনের মত ঘরের কোণে বা বারান্দায় শুয়ে কিংবা হুইল চেয়ারে বসে স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে চলেছে। তারা এক মুঠো স্নেহ পাবার আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনে থাকে। কিন্তু তাদের দিকে ফিরে তাকানোর সময় কারও নেই। স্নেহের পরশ বুলিয়ে তাদের মনের কোণে এক পশলা আশার সঞ্চার করার সময়টুকু কারও নেই।

সুমনের মত লাখো শিশু প্যারালাইজডের মত শারীরিক অক্ষমতা কিংবা বাকশক্তিহীন বা অন্য কোন মানসিক বা শারীরিক অপরিপূর্ণতা নিয়ে দিনযাপন করছে। এরা মানসিক কষ্টে ভুগতে থাকে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় তাদেরকে বোঝা মনে করা হয়। একমাত্র পিতামাতাই তাদের শেষ আশ্রয়স্থল। তারপরও পিতা-মাতা সংসারের অন্যান্য কাজের ব্যস্ততায় সেই গুরুত্ব আর থাকে না। তাদেরকে অকেজো মনে করা হয়। সমাজের বিভিন্ন প্রকার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। যাদেরকে এত কথা বললাম তাদেরকে আমরা প্রতিবন্ধী বলেই জানি।

প্রতিবন্ধী শব্দটার সাথে জুড়ে আছে হাজারও অবহেলা। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা অপরিহার্য। শুধু আমাদের দেশেই নয়, সুমনের মত হাজারও প্রতিবন্ধী পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে। আজ তাদের কথা কে চিন্তা করবে? তাদের সুযোগ-সুবিধা, শিশু অধিকার ও সামাজিক অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্য জাতিসংঘ ১৯৯২ সালে ৩ রা ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস ঘোষণা করেছিল। প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও তাদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করাই এই দিবসের লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস শুধুমাত্র পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সুমনের মত হাজারও প্রতিবন্ধী ঘরের কোণে, বারান্দায় বা মশারীর মধ্যেই থেকে যাবে। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে দিবস পালন ব্যর্থ হবে। আমাদের প্রতিটি দিনই হোক ৩রা ডিসেম্বর। তাদের মানসিক বিকাশের পথ তৈরি করতে হবে। যেখানে তারা তাদের জীবনকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে থাকবে। সোনালী দিনের অপেক্ষায় থাকবে প্রতিটি প্রতিবন্ধী।

প্রতিবন্ধীদের সাথে থাকতে হবে আত্মিক সম্পর্ক। তাদের প্রতি সকলের থাকতে হবে আকুণ্ঠ ভালবাসা, স্নেহ, সহানুভূতি ও যথার্থ সমবেদনা। প্রতিবন্ধীরা থাকবে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের প্রতি সমবেদনা কোন দয়া ভিক্ষা নয়। এই অবস্থার অবসানের জন্য সবার মধ্যে এই উপলব্ধিটুকু থাকতে হবে যে, সুমনের মত শিশুরা আমাদের প্রতিবেশী, তারা কেউ পর নয়। ওরা আমাদেরই আপনজন।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, সরকারি কে সি কলেজ, ঝিনাইদহ।

LEAVE A REPLY