শেখ শোভন
দু’দিন থেকে ফেসবুকের হোমপেজে প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে নানাজনের নানারকম অভিব্যক্তি লক্ষ্য করছি। পত্রপত্রিকা গুলোতে ঘুরে ফিরে আসছে- “৯ লাখ টাকার বিনিময়ে ঢাবিতে ৫ম” পরবর্তীতে জানতে পারলাম, “তাজরিন আহমেদ খান মেধা” এবং নূর মাহফুজা দৃষ্টি নামক দুইজন শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে যথাক্রমে ৫ম এবং ৭৮তম মেধাস্থান অধিকার করেছে।

মূলত, অর্থ পরিশোধে তাদের পরিবার টালবাহানা করার কারনেই এই গোপন তথ্য ফাঁস করা হয়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে এভাবে হয়ত অনেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হয়েছে। ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় হয়ত তারা এবারের জন্য পার পেয়ে গেছে। একজন ঢাবিয়ান হিসেবে সকল শিক্ষার্থীর ন্যায় আমিও মর্মাহত, কিন্তু আশাহত নই।

কারন এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা প্রকাশিত হওয়ায় ২রা ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার সেই কলঙ্কিত শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা নিজেদের প্রমানে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

আশা করি এ ধরনের পদক্ষেপ ঢাবির ইমেজ সমুন্নত রাখতে সহায়তা করবে। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস।

শিশুকাল থেকেই শুনে আসছি প্রায় সময়ই প্রশ্ন ফাঁসের মত লজ্জাজনক ঘটনাগুলো, যে কারনে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে অযোগ্য ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন করছে। বাংলাদেশে খুব কম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যারা শতভাগ নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারবে যে, তাদের প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি বা প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেনি।

সর্বপ্রথম ১৯৭৯ সালে একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের কারনে তা সমালোচিত হয়,পরবর্তীততে ১৯৮০ সালে একটি যুগান্তকারী আইন প্রণীত হয় যা “পাবলিক পরীক্ষা আইন ১৯৮০”নামে বিধিবদ্ধ হয়। এর ৪(১৩) ধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয় যে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত ব্যক্তির ন্যূনতম ০৩ থেকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড এর কথা। কিন্তু পরবর্তীতে উক্ত শাস্তির মাত্রা কমানো হয় ১৯৯২ সালে।

এ সংশোধিত আইনটি ছিল “দ্য পাবলিক এক্সামিনেশন (অফেন্স) ১৯৯২”। এখানে এধরনের অপরাধীর সর্বোচ্চ ০৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদন্ডের বিধান করা হয়। কিন্তু আমার ছোট মস্তিষ্কের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে দেখলাম, বিগত ৩৬ বছরে এই আইনের অধীনে কোন অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি।

আইনের ফাঁক ফোকরের মাধ্যমে অপরাধীরা বারবার কঠিন সাজার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে। একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে এই বিষয়টি মেনে নেওয়া খুবই কঠিন। সচেতন নাগরিক ও বিশিষ্ট্যজনেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে আসছেন।

তাদের সাথে এক্ষেত্রে আমিও আংশিক সহমত পোষণ করি। বরাবরই যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাঝে নিজেদের ব্যর্থতা অস্বীকার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অস্বীকার করার প্রবনতাকে “ডিনায়েল সিনড্রোম” বলা হয়। যা মাদকাসক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

কিন্তু এই রোগটি আমাদের দেশের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষের মাঝেও লক্ষণীয়। ব্যর্থতার দায় কেউই নিতে চায়না। তাই ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করা এবং যথার্থ ব্যবস্থা না নেওয়ায় সমাধানের পথ দিনেদিনে আরো কঠিনতর হচ্ছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নূরুল ইসলাম নাহিদ এধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম বন্ধের চেষ্টা করেছেন বিগত সময়ে।

কিন্তু এই কাজটি কোন একক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। সকলের নিজ স্থান থেকে যথার্থ চেষ্টার মাধ্যমেই জাতিকে এই প্রশ্নফাঁসের মত লজ্জাজনক ঘটনা থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব।

বিগত সময়ে শিক্ষা আইনের খসড়ার ৬৭ নং ধারায় উল্লেখ করা হয়, কোন ব্যক্তি পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করিলে অথবা উক্ত কার্যে জড়িত থাকিলে বা সহায়তা করিলে তিনি সর্বোচ্চ ০৪(চার) বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা একলক্ষ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

অতঃপর আমরা বারংবার লক্ষ্য করেছি শুধুমাত্র অর্থদন্ড দিয়ে অপরাধীরা মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। যা এই দুষ্কৃতিকারী চক্রের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলাফল এ জাতি আজ অবধি ভোগ করে চলছে। শুধুমাত্র আইন কখনওই অপরাধ দমন করতে পারে না।

পাশাপাশি সচেতনতা ও বিবেকবোধেরও প্রয়োজন রয়েছে। যখন পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ুয়া শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্র পায়, তখন তার নিষ্পাপ মনে অজান্তেই “দুর্নীতি” শব্দটি খোদাই হয়ে যায়। যার ফলাফলে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বসেরাও হয়। এ লজ্জা আমাদের সকলের তথা রাষ্ট্রের। এখনই উপযুক্ত সময় এই প্রশ্নফাঁসের মত অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্তি দেবার। এই মুক্তির জন্য শিক্ষক, গবেষক, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, প্রশাসনিক আমলা তথা সমগ্র তরুণ ছাত্রসমাজকে অগ্রণী এবং কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। তবেই হয়ত এদেশের “সোনার বাংলা” নামটি যথার্থতা পাবে।

এই সমস্যা সমাধানের অনেক পথই বরেণ্য শিক্ষাবিদেরা রাষ্ট্রকে দিয়েছেন। তাদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে যতটুকু সম্ভব সরকার আশু পদক্ষেপ নিলেই এ সমস্যা সমাধান হবে বলে আমি মনে করি। প্রথমত, ১৯ জুন ২০১৩ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ৪ টি কার্যকরী সুপারিশ প্রদান করেন এদেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী মহল। এই সুপারিশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ যতটুকু সম্ভব ততটুকু বিবেচনা করা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিৎ।

দ্বিতীয়ত, ১৯৯২ সালের সংশোধিত আইন পরিবর্তন করা জরুরি। কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইন প্রণয়ন সময়েরই দাবি। তৃতীয়ত, সকল শ্রেনী পেশার মানুষের মাঝে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, সকল শ্রেণী পেশার মানুষের। আমার এবং আপনার।

সবশেষে, সবচেয়ে বড় সমাধানটি হলো আমাদের নৈতিকতা এবং বিবেকবোধকে জাগ্রত করা। তা নাহলে রবি ঠাকুরের সেই উক্তিটি- “রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি” আমাদের উপর যথার্থভাবেই বর্তাবে। তাই প্রশ্নফাঁস রোধে যতদ্রুত সম্ভব এদেশের সকল সচেতন নাগরিককে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলেই আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ এধরনের কলঙ্ক থেকে মুক্তি পাবে।

লেখক: শেখ শোভন ,
শিক্ষার্থী ,আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY