সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) এক অনুষ্ঠানে বাংলা শব্দকোষ হইতে ‘মঙ্গা’ শব্দটিকে বিদায় করিয়া দেওয়ার কথা বলিয়াছেন। কেননা দেশে এখন আর মঙ্গা নাই। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তৃতার সূত্র ধরিয়া ‘মঙ্গা’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ জানিতে আমরা সচেষ্ট হই। কিন্তু বাংলা একাডেমি অভিধান, সংসদ বাংলা অভিধান এমনকি বাংলাপিডিয়ায়ও এই শব্দটির সাক্ষাত্ পাওয়া গেল না। অর্থাত্ অর্থমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী এই শব্দটিকে বিদায় জানাইবার প্রয়োজন নাই।

অধিকাংশ অভিধান বা শব্দকোষে এমনিতেই তাহা গরহাজির। তবে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে উত্তরবঙ্গের বহুল আলোচিত ‘মঙ্গা’ এখন বাস্তবেও অস্তিত্বহীন। শুধু মঙ্গা নহে, অর্থমন্ত্রীর ভাষায় আগামী আট বত্সর পর দেশে দরিদ্র লোকই খুঁজিয়া পাওয়া হইবে দুষ্কর। বাংলাদেশ যেহেতু এখন উন্নয়নের মহাসড়কে রহিয়াছে, তাই এই আশাবাদকে অতিরঞ্জিত বলিবার অবকাশ নাই।

প্রকৃতপক্ষে বত্সরের সেপ্টেম্বর হইতে নভেম্বর এবং মার্চ হইতে এপ্রিল পর্যন্ত এই পাঁচ মাসে কৃষিকাজ না থাকায় একসময় বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলায় লোকজন বেকার হইয়া পড়িত। মৌসুমি এই বেকারত্বের কারণে দেখা দিত খাদ্যাভাব। ইহাই পরিচিত ছিল ‘মঙ্গা’ নামে। এই পাঁচটি জেলা হইল- লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও রংপুর। তবে উত্তরবঙ্গের এই মঙ্গা কোনো প্রাকৃতিক সমস্যা ছিল না। ছিল মানুষের তৈরি একটি কৃত্রিম সংকট।

এক ফসলি বোরোর চাষাবাদের কারণে সেখানকার মানুষের কাজের সুযোগ হইয়া পড়িত সীমিত। অন্যদিকে যোগাযোগব্যবস্থার দুর্গমতার কারণে উত্পাদিত ফসলও সঠিকভাবে বাজারজাত করা যাইত না। এখন মঙ্গা না থাকিবার মূল কারণও ঐ একই। এখন কৃষিতে ডাইভারসিফিকেশন বা বহুমুখীকরণ বাড়িয়াছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে আসিয়াছে ব্যাপক পরিবর্তন। সেই সঙ্গে তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নে গ্রামীণ জনপদে ঘটিয়াছে সামাজিক রূপান্তর।
এমনকি, ছোট ও মাঝারি ধরনের শিল্পকারখানাও গড়িয়া উঠিতে শুরু করিয়াছে। সর্বোপরি মঙ্গা নিরসনে পিকেএসএফের অধীন ২৪টি এনজিওর সমন্বয়ে ২০০৬ সাল হইতে ঋণ-সহায়তায় সংযোগ কর্মসূচি পালন করিয়াছে ইতিবাচক ভূমিকা। এইভাবে সরকারি-বেসরকারি নানা প্রচেষ্টায় ‘মঙ্গা’ এখন বিদূরিত, বিতাড়িত।

পিকেএসএফ এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফাইন্যান্সের (আইএনএম) একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৮ সালে উত্তরবঙ্গের মঙ্গাপীড়িত পাঁচ জেলায় মঙ্গার সময় তিন বেলা খাইতে পারিত মাত্র ২৩ শতাংশ পরিবার। ২০১৩ সালে আসিয়া তাহাই উন্নীত হয় ৭৪ শতাংশে। তাহাছাড়া এসব এলাকার একটি পরিবারের বার্ষিক আয় পূর্বের ৩৫ হাজার ৪০০ টাকা হইতে ৪২ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়া দাঁড়ায় ৭৮ হাজার একশত টাকায়। অর্থাত্ আয় বাড়িয়াছে ১২০ শতাংশ। একইসঙ্গে মঙ্গাপীড়িত জেলার পরিবারগুলির বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়।
এই গবেষণার আরো তিন বত্সর পর বর্তমানে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হইবারই কথা। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মনে করেন, যেখানে গণমাধ্যম শক্তিশালী, সেখানে খাদ্যাভাব বা দুর্ভিক্ষ সচরাচর দেখা যায় না। আমাদের শক্তিশালী গণমাধ্যম যখন উত্তরবঙ্গের মঙ্গার কোনো খবরাখবর দিতে পারিতেছে না, তখন আমরা বলিতেই পারি যে, মঙ্গা বিদায় নিয়াছে।

LEAVE A REPLY