বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত এক জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মুসলিম রোহিঙ্গা। দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ছাড়ছেন তারা। দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে তাদের। হন্যে হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরছেন একটু আশ্রয়ের আশায়। ঢুকে পড়ছেন পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশেও।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গায় ভরে গেছে সীমান্তবর্তী এলাকা। তাদের জন্য নির্ধারিত ক্যাম্পগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকছেন অনেকেই।

তবে টেকনাফ ও উখিয়ার আশপাশের পাহাড়ের গাছপালা কেটে বন বিভাগের বাগানে নতুন ঘর তৈরি করে আশ্রয় নিচ্ছেন রোহিঙ্গারা। তবে মানবিক কারণে বন বিভাগ তাদের বাধা না দিলেও এর সুযোগ নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকটি চক্র। তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার নামে ভাড়া দেয়ার জন্য পাহাড়ের বিভিন্ন অংশ কেটে ছোট ছোট অস্থায়ী ঘর তৈরি করছেন।

গত কয়েকদিনে সীমান্তবর্তী এলাকা টেকনাফ, উখিয়া, রামু ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

টেকনাফের অস্থায়ী লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অদূরের একটি পাহাড়ের পাদদেশের বিশাল অংশ কেটে অস্থায়ী ঘর তৈরি করছেন কয়েকজন শ্রমিক। জানতে চাইলে তারা জানান, স্থানীয় এক নেতা রোহিঙ্গাদের রাখতে ঘরগুলো তৈরি করছেন। এর বাহিরে তারা কিছু জানেন না। শ্রমিক হিসেবে দৈনিক ২০০ টাকা মজুরিতে তারা এখানে কাজ করছেন।

ওই ক্যাম্প থেকে টেকনাফ-উখিয়া প্রধান সড়কের দিকে আসতে পুরোনো দুটি পাহাড়ের নিচে আরো নতুন দুটি ঘর তৈরি করতে দেখা গেছে। জানতে চাইলে দাঁড়িয়ে থাকা মালিক কথা বলতে রাজি হননি। কর্মরত একজন মিস্ত্রি জানান, মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে আশা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতেই ঘরগুলো তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি রুম মাসে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা করে ভাড়া দেয়া হবে।

এছাড়া টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ের মধ্যেও শতশত অস্থায়ী ঘর তৈরি হচ্ছে বলে রোহিঙ্গাদের একটি সূত্র জানিয়েছে। তারা বলছেন, এখন যারা পালিয়ে আসছে তাদের সহায়-সম্বল বলে কিছুই নেই। এসব ঘর ভাড়া নিতে বাধ্য করা হয়। ঘরগুলোতে না উঠলে পুলিশ কিংবা বিজিবিকে ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। এভাবে প্রভাবশালীদের তৈরি করা অস্থায়ী ঘরগুলো ভাড়া নিতে বাধ্য করা হয় রোহিঙ্গাদের।

গত বৃহস্পতিবার রাতে পালিয়ে আসা এক দল রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পামেল নামে একটি পাহাড়ের নিচে। সেখানে নতুন করে কয়েকটি ঘর তৈরি করা হয়েছে।

মোরিয়ম বেগম নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও স্থানীয় মগ দস্যুদের হামলায় সর্বস্ব হারিয়ে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। সীমান্ত এলাকা পার হওয়ার জন্য অন্তত ২০দিন মিয়ানমার সীমান্তের কুমিরখালীর গহীন পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন। সেখান থেকে রাতে শরীফ নামে একজন দালালের মাধ্যমে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে টেকনাফে এসেছেন। তবে শরীফের বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না তিনি। শরীফ নিজেই তাদেরকে এখানে থাকতে বাধ্য করছেন।

মোরিয়ম বেগম আরো বলেন, শুধু রুম ভাড়া নয়। এসব ঘরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিভিন্ন স্থানে দৈনিক কাজের জন্য বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে বিক্রি করা হয় ২৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। কিন্তু রোহিঙ্গারা পান দৈনিক ১৫০-২৫০ টাকা। সরদার হিসেবে বাকি টাকা নিয়ে নেন স্থানীয় আশ্রয়দাতা। শুধু বর্তমানে এমনটি হচ্ছে তা নয় অতীতেও এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়া নতুন তৈরি করা ঘরে আশ্রয় দেয়া রোহিঙ্গাদের দিয়ে মাদক, ইয়াবা ও পতিতাবৃত্তিসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড করার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। রোহিঙ্গাদের দূরাবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এই চক্রটি রাতারাতি বনে যাচ্ছে কোটিপতি।

বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭৪ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। বিশাল এ সীমান্ত এলাকার গহীন জঙ্গল, নাফ নদী ও সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে দিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।

শুক্রবার (২ নভেম্বর) রাতেও দল বেঁধে শতশত রোহিঙ্গা টেকনাফের লেদা ও উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে এসেছে। তবে এসব ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের ঘরে জায়গা না থাকায় অনেক রোহিঙ্গাকে খোলা আকাশের নিচে রাত্রীযাপন করতে দেখা গেছে। বাংলাদেশে আগে থেকে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গারা ও স্থানীয় একটি দালাল চক্র তাদেরকে আশ্রয় দিচ্ছেন।

জানা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৩ হাজার ১৮৯ জন রোহিঙ্গা বসবাস করে। পার্শ্ববর্তী নয়াপাড়া ও উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ঝুঁপড়ি ঘর নির্মাণ করে বন বিভাগের জমি দখল করে বসবাস করছে আরো লক্ষাধিক রোহিঙ্গা।

অপরদিকে, টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া ক্যাম্পে রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ১৭ হাজার ২০০ হলেও আরো অর্ধ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা লেদা এলাকায় অবৈধ ঝুঁপড়িতে বসবাস করে আসছে।

এসব এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গত ২৩ দিনে অন্তত অর্ধ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এখানে এসেছেন। যারা আসছে তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এদের ঘরের পুরুষদের হত্যা বা গুম করা হয়েছে মিয়ানমারে। ক্যাম্পের কোনা ঘরে জায়গা নেই। একজনের বিছানায় থাকছেন ৫ জন করে। কেউ কেউ জায়গা না পেয়ে থাকছেন ক্যাম্পের আশপাশের বাড়িঘর ও রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে।

LEAVE A REPLY