পলাতক শরীয়তপুরের মৌলভী ইদ্রিস আলী সরদারের যুদ্ধাপরাধ মামলায় ৪৮৬পৃষ্ঠার রায় ঘোষণা করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলায় অভিযুক্ত অপর আসামি মাওলানা সোলায়মান মোল্যা ওরফে সোলায়মান মৌলভী গত ২৫ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ফলে আসামিদের অনুপস্থিতিতেই এ মামলার রায় দিচ্ছে আদালত।

একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরীয়তপুর ও মাদারীপুর এলাকায় গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুটপাট-অগ্নিসংযোগ ও হিন্দুদের দেশান্তরে বাধ্য করার মত মানবতাবিরোধী অপরাধের চার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে পলাতক ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে।

আজ সোমবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে বিচারপতি আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে রায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যানের প্রারম্ভিক বক্তব্যে জানান, তারা যে রায় দিতে যাচ্ছেন, তা এসেছে সংখ‌্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।

পরে বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম ৪৮৬ পৃষ্ঠার রায়ের সার সংক্ষেপ পড়া শুরু করেন। অপর বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীও এজলাসে উপস্থিত রয়েছেন। সবশেষে বিচারপতি আনোয়ারুল হক সাজা ঘোষণা করবেন।

২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর এটি ২৭তম রায়।

যুদ্ধাপরাধের চার ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে চলতি বছর ২ মে ইদ্রিস ও সোলায়মানের বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে আদালত গত ২ নভেম্বর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে।

এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ১৩ জনের সাক্ষ্য শুনেছে আদালত। আসামিপক্ষে কোনো সাফাই সাক্ষী ছিলেন না।

এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমের সঙ্গে ঋষিকেশ সাহা ও রেজিয়া সুলতানা চমন শুনানিতে অংশ নেন। তারা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আরজি জানান।

অন্যদিকে, পলাতক ইদ্রিসের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসাবে শুনানি করেন গাজী এমএইচ তামিম।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া ইউনিয়নের পালং থানার পশ্চিম কাশাভোগ গ্রামের ইদ্রিস আলী সরদার স্থানীয় রুদ্রকর নিনমনি হাই স্কুল থেকে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাস করেন। ওই স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন।

প্রসিকিউশনের তদন্ত সংস্থার তথ‌্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইদ্রিস ছাত্র সংঘের স্থানীয় নেতায় পরিণত হন। ছাত্রসংঘের অন‌্য অনেক নেতাকর্মীর মত তিনিও পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় গড়ে তোলা রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন এবং যুদ্ধাপরাধে অংশ নেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি জামায়াতের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন বলে তদন্ত সংস্থার ভাষ্য।

পালং থানার কাশিপুর গ্রামের সোলায়মান মোল্যার জন্ম ১৯৩১ সালে। ১৯৬৩ সালে তিনি দাওরা পাস করে মুসলিম লীগে (ফজলুল কাদের) এ যোগ দেন। পরে তাকে পালং থানা মুসলিম লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকও করা হয়।

অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ এর নির্বাচনে জামিয়াতুল উলামায় ই-ইসলামীতে যোগ দিয়ে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন সোলায়মান।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নিজের এলাকায় শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দেন এবং পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেন বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার স্বর্ণঘোষ গ্রামের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ তালুকদার ২০১০ সালের ১১ মে ইদ্রিস আলী ও সোলায়মান মোল্যাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে শরীয়তপুরের আদালতে মামলা করেন। ওই মামলা পরে পাঠানো হয় ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল অনুসন্ধান শেষে ইদ্রিস ও সোলায়মানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। গতবছর ২২ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নিয়ে চলতি বছর মে মাসে অভিযোগ গঠন করে।

LEAVE A REPLY