গণতন্ত্রের মানসপুত্র, উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বরেণ্য এ নেতা ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর লেবাননের বৈরুতে একটি হোটেল কক্ষে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার হাইকোর্ট বিভাগের পাশে তিন নেতার মাজারে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাজার।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ফল ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট এবং অবিস্মরণীয় বিজয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন যুক্তফ্রন্ট গঠনের মূল নেতাদের মধ্যে অন্যতম। গণতান্ত্রিক রীতি ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তিনি, তাই সুধী সমাজ কর্তৃক ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ বলে আখ্যায়িত হন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এদেশের শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি মুসলিম লীগ সরকারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন। তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের গণবিরোধী কার্যকলাপের       বিরুদ্ধে শহীদ সোহরাওয়ার্দী এদেশের জনগণকে সোচ্চার করেছিলেন।

তিনি তাদেরকে বিভিন্নভাবে সংগঠিত করেছিলেন। কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই নন, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কও। তার প্রচেষ্টায় ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়।বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি ছিলেন বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দীর কনিষ্ঠ সন্তান। জাহিদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতা হাইকোর্টের একজন খ্যাতনামা বিচারক ছিলেন। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করার পর যোগ দেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেখান থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি তার মায়ের অনুরোধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষা এবং সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯১৩ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান তিনি। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া সেখানে তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং বিসিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯১৮ সালে বার এট ল ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯২১ সালে কলকাতায় ফিরে এসে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। ১৯২০ সালে তিনি বেগম নেয়াজ ফাতেমাকে বিয়ে করেন। বেগম নেয়াজ ফাতেমা ছিলেন তত্কালীন বৃটিশ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আবদুর রহিমের কন্যা।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী

হাসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, উপমহাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এক অনন্য নাম।

তিনি ছিলেন প্রতিভাবান রাজনৈতিক সংগঠক, আইনজ্ঞ, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভা ও গণপরিষদের সদস্য এবং অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রীসহ তত্কালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে শ্রমজীবীসহ এতদঞ্চলের অবহেলিত মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা ও জনগণের সার্বিক কল্যাণে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আমার বিশ্বাস। রাষ্ট্রপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উপমহাদেশের মুসলমানদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার সংগ্রামে আজীবন কাজ করেছেন। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় গণমানুষের সংগঠন আওয়ামী লীগ আরও বিকশিত হয়। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গঠিত হয় জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

তিনি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিকাশে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন।  প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচি

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আজ সকাল ৮টায় বাংলাদেশ হাইকোর্ট সংলগ্ন মরহুম হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর মাজারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাতের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এক বিবৃতিতে মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পুণ্য স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, তিনি গণতন্ত্রের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।

তাঁর নেতৃত্বের অসাধারণ বলিষ্ঠতা, দৃঢ়তা ও গুণাবলী জাতিকে সঠিক পথের দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। গণতন্ত্র, ন্যায় বিচার ও আইন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি অসাধারণ অবদান রেখেছেন। বিবৃতিতে তিনি গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করার জন্য আওয়ামী লীগ, তার সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের সকল স্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে জেপির বিবৃতি

গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান  পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম।

এক যৌথ বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, মরহুম নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা এবং আজীবন তিনি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। এ জন্য জাতি তাকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসাবেই জানে।

তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তত্কালীন পাকিস্তানে ১ম বিরোধী দল আওয়ামী লীগের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতিভাবান রাজনীতিবিদ ও তাঁর সাংগঠনিক প্রতিভা ছিল বিস্ময়কর। তিনি ছিলেন একজন অনন্যসাধারণ পার্লামেন্টারিয়ান এবং উচ্চমানের আইনজীবী।

জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, জাতীয় নেতার ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সমগ্র জাতির সাথে আমরা তাকে স্মরণ করছি বিনম্র শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়। আমরা মরহুম নেতার রুহের মাগফেরাত কামনা করি এবং তার মৃত্যুঞ্জয়ী আদর্শ অনুসরণের জন্য নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানাই জাতীয় নেতার ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য।

সোহরাওয়ার্দীর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পার্টির (জেপি) পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আজ সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় পার্টির (জেপি) পক্ষ হতে মরহুমের মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে।

বিকাল সাড়ে ৩টায় কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে (মাল্টিপারপাস হল) জাতীয় পার্টির (জেপি) উদ্যোগে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি।

প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। বিশেষ অতিথি থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসূফ হোসেন হুমায়ূন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ডঃ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজউদ্দিন আহম্মেদসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

LEAVE A REPLY