আলোচনাটা বোধ হয় শুরু করে দেওয়াই যায়। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো চতুর্থবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়। ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি, মার্কো ফন বাস্তেন কিংবা ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারদের ছাপিয়ে যাওয়া এই অর্জনে পর্তুগিজ তারকা নিজেকে সর্বকালের সেরা ইউরোপিয়ান ফুটবলার ভাবতেই পারেন।

গত জানুয়ারিতে ফিফা-ব্যালন ডি’অরের পুরস্কারটা পাওয়া হয়নি তাঁর। আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি তাঁকে পেছনে ফেলে পুরস্কারটা জিতে নেওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন পর্তুগিজ তারকা বোধ হয় আর কখনোই ‘সেরা’ হতে পারবেন না। কিন্তু ব্যালন ডি’অর ফিফার মালিকানা থেকে বেরিয়ে ফ্রান্স ফুটবলের একক মালিকানায় আসতেই পুরস্কারটি যেন খুঁজে নিল তাঁর পুরোনো প্রার্থীকে। ২০০৮ সালে ফ্রান্স ফুটবলের অধীনে থাকার সময়ই প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন রোনালদো। এরপর ফিফার অধীনে চলে যাওয়ার পর রোনালদো জিতেছেন একবার। লিওনেল মেসির মতো ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের সঙ্গে দ্বৈরথ লড়েই তাঁর এ অর্জন।

ফ্রান্স ফুটবলের অধীনে দুবার, আর ফিফার অধীনে দুবার—রোনালদোর মোট চারবারের ব্যালন ডি’অর অর্জন পাঁচবার জয়ী লিওনেল মেসির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। একই পুরস্কার ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি, মার্কো ফন বাস্তেন জিতেছেন তিনবার করে, বেকেনবাওয়ার, কিগান, রুমেনিগেরা দুইবার করে। রোনালদো এই গ্রেটদের সবাইকে ছাপিয়ে গিয়ে নিজেকে সর্বকালের সেরা তাই ভাবতেই পারেন!

এক হিসেবে রোনালদোর লড়াইটা কিন্তু এই কিংবদন্তিদের চেয়েও অনেক কঠিন। ক্রুইফ নিজের সময় ছিলেন ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলার। তিনবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, দ্বিতীয় সেরা হয়েছেন একবার। নিজের প্রতিভা দিয়েই আয়াক্সকে তিনবার ইউরোপিয়ান কাপের সেরা বানিয়েছিলেন। ‘টোটাল ফুটবল’ ধারণার জন্ম দিয়ে হল্যান্ডকে ১৯৭৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছেও নিয়ে গিয়েছিলেন।

জাতীয় দলের হয়ে ৪৮টি ম্যাচ খেলে ৩৩ গোল করা এই ডাচ ফুটবলার বার্সেলোনার হয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য উচ্চতায়। ৬৬১ ম্যাচে ৩৬৯ গোল করা ক্রুইফকে অনেকেই ইউরোপের সর্বকালের সেরা মেনে নেবেন বিনা দ্বিধাতেই।

প্লাতিনিও তিনবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, দ্বিতীয়-সেরাও তিনি হয়েছেন দুইবার। ১৯৮২ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তোলার পাশাপাশি জুভেন্টাসের হয়ে ইউরোপিয়ান কাপ ও ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপ জয়ী এই ফরাসি কিংবদন্তির ক্যারিয়ারে গোলসংখ্যা ৩১২। মার্কো ফন বাস্তেনের কথাই ধরুন। ১৯৮৮ সালে সেই শূন্য কোণ থেকে ভলির সাহায্যে সেই অসাধারণ গোল করে হল্যান্ডকে ইউরোর শিরোপা এনে দিয়েছিলেন। চোটের কারণে মাত্র ২৮ বছর বয়সে ক্যারিয়ারের ইতি টানা বাস্তেন এসি মিলানের হয়ে ৩৭৩ ম্যাচে করেছেন ২৭৭ গোল। ব্যালন ডি’অর তিনবার ঘরে নিয়ে যাওয়া এই ডাচ ফুটবলারও ইউরোপের সর্বকালের সেরাদের তালিকায় চলে আসবেন খুব সহজেই।

রোনালদোর এদের সবার চেয়ে হয়তো এগিয়ে থাকবেন অন্য একটা কারণে। তাঁকে লড়তে হচ্ছে লিওনেল মেসির মতো একজনের সঙ্গে। ক্রুইফ, প্লাতিনি, বাস্তেনদের কী মেসির মতো কোনো ‘চ্যাম্পিয়নের’র সঙ্গে লড়তে হয়েছিল? বেকেনবাওয়ার, রুমেনিগেরাও তো ইউরোপীয় সার্কিটে রোনালদোর মতো কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হননি। একবার করে ব্যালন ডি’অরের স্বাদ পাওয়া রুদ খুলিত, রাবার্তো বাজ্জো, জর্জ বেস্ট, ববি চার্লটন, ইউসেবিও, লুইস ফিগো, জিনেদিন জিদান, জার্ড মুলার, জিয়ান্নি রিভেরা, রিস্টো স্টয়চকভরাও অর্জনে রোনালদোর চেয়ে পিছিয়ে থাকবেন বড় ব্যবধানেই। যদিও তাঁদের অনেকেরই শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ব্যালন ডি’অর দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

রিয়াল মাদ্রিদ তারকা আলফ্রেডো ডি স্টেফানো অবশ্য আর্জেন্টিনা থেকে এসে স্প্যানিশ হয়ে জিতেছিলেন ব্যালন ডি’অর। সেই সময় যখন পুরস্কারটি ইউরোপের বাইরে দেওয়া হতো না। এই হিসেবে বাদ পড়ে যান সর্বকালের দুই সেরা কিংবদন্তি পেলে ও ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৯৫ সালের পর এই পুরস্কারটি সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর মেসির পাঁচবারের অর্জন অবশ্যই বিশেষ কিছু। এরপরই আছেন দুবার পাওয়া ব্রাজিলের রোনালদো। লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ আর ব্রাজিলের আরেক তারকা কাকা পেয়েছেন একবার করে।

মেসির মতো ফুটবলারের যুগে তাঁর সঙ্গেই জোর লড়াই চালিয়ে চারবার ব্যালন ডি’ অর জয়, সঙ্গে ক্যারিয়ারে ৪৯৯ গোল রোনালদোকে সবার চেয়ে এগিয়ে দিচ্ছে পরিসংখ্যানে। মেসিকে তো অনেকেই সর্বকালের সেরা হিসেবে মেনে নিতে চান। এই একটি জায়গায় ক্রুইফ, প্লাতিনি, বাস্তেন কিংবা ফিগো, জিদানরা পিছিয়ে পড়েন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চেয়ে।

তাহলে কি রোনালদোই সর্বকালের সেরা ইউরোপীয় ফুটবলার? ব্যাপারটা অবশ্যই তর্ক-সাপেক্ষ। বিশেষ করে ক্রুইফ, প্লাতিনি, জিদানদের খেলতে দেখা প্রজন্মের এতে একমত না হওয়াই স্বাভাবিক। তবে কেবল ব্যালন ডি’অরকে যদি মানদণ্ড ধরা হয়, রোনালদো এগিয়ে থাকবেন বড় ব্যবধানেই!

LEAVE A REPLY