নিউজ ডেস্ক
আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান ও গৌরবের বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জনের দিন। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ের ৪৫ বছর পূর্ণ হল আজ। কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সেই অকুতোভয় বীরদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এসেছে এ বিজয়, বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, নিপীড়ন আর দুঃশাসনের কুহেলিকা ভেদ করে বিজয়ের প্রভাতী সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করে ওঠেছিল বাংলাদেশের শিশির ভেজা মাটি। অবসান হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাড়ে তেইশ বছরের নির্বিচার শোষণ, বঞ্চনা আর নির্যাতনের। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করে এইদিনই বীর বাঙালি জাতি ছিনিয়ে এনেছিল লাল-সবুজের পতাকা। স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে এক নতুন ‘মহাকাব্য’ তৈরি হয়েছিল। সেই কাব্যের নাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল  সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

লাখো স্বজন হারানোর শোকে ব্যথাতুর, বিহ্বল হওয়ারও দিন আজ। জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করবে সেই শহীদদের যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি উদযাপনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আজ সরকারি ছুটির দিন। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে নামবে শহীদদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ জনতার ঢল।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী: মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও চেতনা বাস্তবায়নে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে আরো অবদান রাখতে দলমত নির্বিশেষে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে আরো অর্থবহ করতে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে দলমত নির্বিশেষে একযোগে কাজ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, আসুন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করি। সবাই মিলে একটি সেবামুখী, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। প্রতিষ্ঠা করি- জাতির পিতার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’।

কর্মসূচি: দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সূর্যোদয়ের সময় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় সেনাবাহিনীর আমন্ত্রিত সদস্যগণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচি : মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ৩ দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রথম দিন সূর্যোদয়ের ক্ষণে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে, বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী সংগঠনের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৬টা ৩৪ মিনিটে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন। সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, জিয়ারত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। বিকাল ৩টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিখা চিরন্তনে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শুরু হবে বিজয় র‌্যালি যা ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে শেষ হবে। পরের দিন শনিবার বিকাল ৩টায় রয়েছে আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার সন্ধ্যা ৬টায় ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবরে রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে দেশের বরেণ্য শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করবেন।

বিএনপির কর্মসূচি : সকাল ৮টায় সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন। এরপর সেখান থেকে ফিরে এসে শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন তিনি। এর আগে ভোরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। বিজয় দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার বিএনপির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচি : জাতীয় পার্টি, সিপিবি, গণফোরাম, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ ’৭১, আইডিইবি, মহিলা পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল ইন্সটিটিউট, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ও পুনর্বাসন সোসাইটি, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, সার্চ স্কেটিং ক্লাব, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রভৃতি সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ: আজ সকাল ১০টায় তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমভিত্তিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রীও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া বিকাল পৌঁনে ৪টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মিলিত হবেন। এ অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন।

নৌ বাহিনীর জাহাজ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে : মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে নৌ বাহিনীর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও চাঁদপুরের নির্ধারিত জাহাজগুলো সর্বসাধারণের জন্য আজ দুপুর ২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে।

LEAVE A REPLY