বাংলাদেশী কৃষকরা ইটালিয়ান লাউ চাষ করে সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন

কৃষি ডেস্ক: বাংলাদেশে ইটালিয়ান লাউ চাষ করে সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। বিদেশি জাতের এই লাউ চাষ বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার নতুন দ্বার। আর্থিকভাবেও এই লাউ চাষে রয়েছে সফলতার সুযোগ।

ইটালিয়ান লাউ মূলত ইটালিয়ান একটি সবজি। এটি ইটালিতে লং স্কোয়াস বা ইটালিয়ান কুকুজ্জা লাউও বলা হয়। সরু এই লাউ ১০ থেকে ১২ ফুট লম্বা হয়। যা খেতেও বেশ সুস্বাদু। এই লাউ গাছের জন্য উঁচু মাচা করতে হয়। সমতল ভূমিতে এই লাউ আঁকা-বাঁকা হয়ে ছড়িয়ে পরে। তাই এই লাউ চাষে উঁচু মাচা অপরিহার্য।

জার্মান ভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড এর অর্থায়নে ইনসিডিন বাংলাদেশের বাস্তবায়নে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া ইউনিয়নের একটি নার্সারিতে ইটালিয়ান লাউ চাষে প্রাথমিকভাবে সফলতা পাওয়া গেছে। তারা স্বপ্ন দেখছেন ভবিষ্যতে এই লাউ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে।

ইটালিয়ান লাউ চাষের জন্য আমাদের দেশি প্রজাতির লাউ চাষের মতো প্রথমে  বীজ বপন ও চারা উৎপাদন করতে হয়। পলিথিন ব্যাগে চারা তৈরি করলে উৎপাদন খরচ কম পড়ে। পলিথিন ব্যাগে চারা উৎপাদন করে রোপণ করলে হেক্টর প্রতি ৮০০-১০০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।

ইটালিয়ান লাউ চাষের জন্য দুই/তিন মিটার দূরত্বে প্রতি মাদায় (যেটুকু মাটিতে বীজ বা চারা রোপণ করা হয়) তিন-চারটি বীজ বোনা উচিত। এছাড়া কচুরীপানার ওপর মাটি দিয়ে বীজ বুনেও সেখানে লাউ জন্মানো যায়। আমাদের দেশি প্রজাতির লাউ চাষের মতো এই ইটালিয়ান প্রজাতির লাউও বসতবাড়ির আশে পাশে যেমন-গোয়াল ঘরের কোণায় বা পুকুর পাড়ে লাগানো যেতে পারে। তবে কেউ যদি বাণিজ্যিক উদ্দেশে বেশি জমিতে এই লাউ চাষ করতে চান তাহলে প্রথমে জমি ভালোভাবে মই (কর্ষণ) দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে।

এই লাউ চাষের প্রধান শর্ত হচ্ছে উচু মাচার ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়মিত গাছের গোড়ায় পানি সেচ, মাটির চটা ভাঙা, ছাউনি ও কৃষিবিদদের পরামর্শ মতো সার ও কীটনাশক দিতে হবে।

আমাদের দেশি লাউয়ের মতো এটি সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। শুধু লাউ নয়, লাউয়ের খোসা, ডগা ও পাতাও খাওয়া যায়। লাউয়ের পাতা ও ডগা শাক হিসেবে এবং লাউ তরকারি ও ভাজি হিসেবে খাওয়া যায়। লাউয়ের চেয়ে এর শাক বেশি পুষ্টিকর বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নার্সারির কৃষক খোকন শিকদার জানান, ২০১৪ সালে প্রথম এখানে ইটালিয়ান লাউ আবাদ করা হয়। প্রথম বছর তেমন একটা ভালো ফল না পাওয়া গেলেও পরে আবারো এই লাউ আবাদ করা হয়। এই বছর এখানে ইটালিয়ান লাউয়ের ভালো ফলন হয়েছে। প্রতিটি গাছেই ভালো লাউ ধরেছে। লাউগুলো পাঁচ থেকে আট ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। এরপর ব্যাপকভাবে এই লাউ আবাদ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশি লাউয়ের মতো প্রথমে জমি তৈরি করে বীজ বপন ও চারা উৎপাদন করে তা রোপণ করতে হয়। পরে চারাগাছ বাড়তে শুরু করলে উঁচু মাচা দেওয়া হয়। চারাগাছ রোপণের দুই সপ্তাহের মধ্যে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। দ্রুত বর্ধনশীল এই লাউ চাষের জন্য আট থেকে ১০ ফুট উঁচু মাচা তৈরি করতে হয়।

নার্সারির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান হীরু বলেন, এটি চাষাবাদে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হবে। তবে আমরা এখনো এই বীজ কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করিনি। আমরা আমাদের নার্সারিতে আবাদ করে সফলতা পেয়েছি। আশা করছি কৃষকরাও এই লাউ চাষ করে সফল হবে। এ বছর আমরা এই লাউ থেকে বীজ সংরক্ষণ করেছি। প্রথমে আমাদের নার্সারির আওতাভুক্ত কৃষকদের মধ্যে এই বীজ বিতরণ করে মাঠ পর্যায়ে এটি চাষে কি ধরনের সাড়া পাওয়া যায় সেটা দেখবো। ভালো সাড়া পেলে বাণিজ্যিক উদ্দেশে এখানে চারা উৎপাদন করা হবে।

এটি যেহেতু বিদেশি সবজি তাই এখানে এই লাউ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হবে। তাই এটি চাষ করে অনেক কৃষক লাভবান হবে। কম খরচে অধিক উৎপাদনের জন্য এই লাউ কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলবে বলেই আমার বিশ্বাস।

উন্নয়ন সংগঠন ইনসিডিন বাংলাদেশের নার্সারির সুবিধাভোগী স্থানীয় ঘুটাবাছা ইউনিয়নের কৃষক জাহিদুল ইসলাম ফারুক  বলেন, প্রথমবার যখন এখানে এই ইটালিয়ান লাউ চাষ করা হয়, তখন থেকেই আমি এই লাউ আবাদ করতে চেয়েছি। কিন্তু বীজের অভাবে করতে পারিনি। এ বছর এখান থেকে বীজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আশা করি এই লাউ চাষ করে সফল হবো।

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহিনুর আজম খান বলেন, এটি আমাদের কাছে অপরিচিত একটি সবজি। এটি চাষে প্রাথমিকভাবে সফলতা পাওয়া গেছে। কৃষক পর্যায়েও যদি এভাবে সফলতা পাওয়া যায়, তাহলে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।

তিনি আরো বলেন, যেহেতু এটি একটি বিদেশি সবজি তাই এর বীজ পাওয়া খুব একটা সহজ হবে না। এর বীজ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারলে এদেশেও এই লাউ চাষাবাদ ফলপ্রসু হবে।