জনপ্রিয় ভোজ্য সয়াবিন তেল ফসল চাষ

 কৃষি ডেস্ক: বাংলাদেশে সবচাইতে জনপ্রিয় ভোজ্য তেল সয়াবিন। তবে ভোজ্য তেলের চাইতেও সয়াবিনের বড় পরিচয় এটি পুরোটাই প্রোটিনসমৃদ্ধ। মাছ-মাংসের চেয়ে এতে প্রোটিন কোন অংশেই কম নয়।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশে সাধারণ কৃষি ফসলের মতো সয়াবিন চাষ করে বিপ্লব ঘটানো যেতে পারে। শীতকালে যেসব জমিতে সেচের অভাবে ধান বা অন্যান্য রবি ফসল চাষ সম্ভব নয়, সেসব জমিতে অনায়াসে সয়াবিন চাষ করা সম্ভব।

সয়াবিন চাষ ও এর সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি কথা হয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)’র সুবর্ণচর উপজেলায় ডাল

ও তৈল বীজ বর্ধন খামার এবং বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের সাথে।

তিনি জানান, আমাদের দেশে যেসব এলাকায় পানির অভাব আছে সেসব এলাকায় সমন্বিতভাবে সয়াবিন চাষ করলে আমাদের সয়াবিন বা পাম তেল আমদানির প্রয়োজন হবে না। অধিকন্তু, সয়াবিন তেলের উপজাত সয়ামিল পশু খাদ্যের উপকরণ হিসাবে বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব হবে।

Soyabin Dana
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, একসময় বাংলাদেশে সয়াবিনের পুরো চাহিদা মেটানো হতো রপ্তানির মাধ্যমে। কিন্তু, বর্তমানে দেশে আবাদ করে চাহিদার অনেকাংশ পূরণ করা হচ্ছে। সয়াবিন এখন লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী অঞ্চলের প্রধান কৃষিফসল। শুধু লক্ষ্মীপুরেই গত বছর প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে সয়াবিনের চাষ হয়। সেখান থেকে আবাদ পাওয়া গেছে ৯০ হাজার মেট্রিক টন সয়াবিন, যার বাজারমূল্য ৩০০ কোটি টাকার ওপর।

কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের আবহাওয়া, মাটি, জলবায়ু সয়াবিন চাষের উপযোগী। একটু সচেতন হলেই বাড়তি খরচ ছাড়াই কৃষকরা সয়াবিন চাষ করতে পারেন। বাড়ির আশপাশে পতিত, ধানি, চর, পাহাড়ি জমি থেকে শুরু করে সব ধরণের জমিতে এর চাষাবাদ সম্ভব বলে মতামত দিয়েছেন তারা। সয়াবিনে ৪০-৪৫ ভাগ আমিষ ও ১৯-২২ ভাগ তেল রয়েছে। অন্যান্য ডাল ও শুঁটি জাতীয় শস্যের তুলনায় সয়াবিন দ্বিগুণ আমিষসম্পন্ন অথচ দাম কম।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পৃক্ত চর্বি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক এলডিএল কোলস্টেরল বাড়িয়ে দেয় আর অসম্পৃক্ত চর্বি দেহ থেকে কোলস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। প্রাণঘাতি হৃদরোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে দেহ থেকে এলডিএল কোলস্টেরল দূর করতে হবে। সম্পৃক্ত চর্বি ট্রান্স ফ্যাটিএসিড এবং ডায়েটারি কোলস্টেরল রক্তে ক্ষতিকারক কোলস্টেরল বৃদ্ধি করে। তাই স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের এমন একটি রান্নার তেল বেছে নেয়া উচিত যাতে অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি হবে। নারিকেল তেল, পাম তেল, ও পাম কার্নেল তেলে অধিক পরিমাণ সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে। অপরপক্ষে অলিভ, সূর্যমূখি, ভুট্টা, তিল এবং সয়াবিন থেকে প্রাপ্ত তেলে প্রচুর পরিমান অসম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে। ক্যানোলা, সরিষা এবং বাদাম তেলে রান্না করাও নিরাপদ। তবে যে কোন প্রকার তেল যতটুকু সম্ভব কম ব্যবহার করা উচিত বলেও মত দিয়েছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা।

সয়াবিনে স্বাস্থ্য হ্রাস : ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন হৃদরোগ প্রতিরোধে সয়াপ্রোটিনের কার্যকর ভূমিকার স্বীকৃতি প্রদান করে বলে জানা যায়। একটি বিবৃতির মাধ্যমে ইউএস এফডিএ ঘোষণা করে যে, প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫ গ্রাম সয়াপ্রোটিন কম চর্বিযুক্ত খাদ্যের সাথে গ্রহণ করলে হৃদরোগের আশঙ্কা কমে যায়। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশ এবং এশিয়ার জাপান, চীন, ভারত প্রভৃতি দেশ একই স্বীকৃতি প্রদান করে বলেও জানা যায়।

সয়াবিনে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস : যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের সাথে সহমত পোষণ করে সারা বিশ্বের খাদ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা সয়াবিনের উপর ব্যাপক গবেষণা করে জানতে পারেন বেশ কিছু কারণে সয়াবিন হৃদরোগের আশঙ্কা কমিয়ে দেয়। এগুলো হলো-সয়াপ্রোটিন রক্তের উচ্চমাত্রার এলডিএল কোলস্টেরল কমায়, এইচডিএল উপকারী কোলস্টেরল বৃদ্ধি করে, রক্তের উচ্চমাত্রার ট্রাইগ্লিসারাইড কমায়, রক্তের জমাট বাঁধা নিয়ন্ত্রণ করে, রক্তনালী মসৃণ রাখে এবং  ক্যালসিয়াম চ্যানেল ইনহিবিটর হিসেবে কাজ করে।

এ ছাড়া সয়াবিনের তেলে বিদ্যমান লিনোলিক ও আলফা লিনোলিক অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড খুবই উপকারী। এর অভাব হলে মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়, ত্বক খসখসে হয়ে যায় এবং নতুন কোষ-কলা তৈরী ব্যাহত হয়।

LEAVE A REPLY