রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন?

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবার রাষ্ট্রপতির কাছে যে প্রস্তাব পেশ করেছে, তাতে নতুনত্ব রয়েছে। কেননা, ইতিহাসে এবারই প্রথম প্রধানমন্ত্রী দেশের রাষ্ট্রপতিকে ‘যেরূপ উপযুক্ত বিবেচনা করবেন’, তেমন করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। তাই ‘যেরূপ উপযুক্ত বিবেচনা করবেন’ কথার অর্থ দাঁড়ায়, রাষ্ট্রপতি কাজটি স্বাধীনভাবে করতে পারবেন। অতএব বলা যায়, বল এখন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির কোর্টে।
১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা যে মতামত রাষ্ট্রপতিকে লিখিতভাবে অবহিত করেছেন, সেটাকে আপাতদৃষ্টে প্রধানমন্ত্রীর মতামত হিসেবে গণ্য না করার কোনো কারণ নেই। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে চলতে হয়।
১১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের পেশ করা চারটি নির্দিষ্ট প্রস্তাবের প্রথমটিতে অবশ্য বলা হয়েছে, সংবিধানের ১১৮-এর বিধানমতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন। কিন্তু সংবিধানমতে রাষ্ট্রপতি শুধু ১১৮-এর বিধানমতে এককভাবে চলতে পারবেন না। তাঁকে সংবিধানের ৪৮(৩) এবং ১৯৯৬ সালের রুলস অব বিজনেসের বিধান মনে রাখতে হবে। রুলস অব বিজনেস বলেছে, ১১৮-এর বিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দিতে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর মতামত নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ‘রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীনভাবে’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ায় রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন দলের মতামতের ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব বিবেচনায় এই নিয়োগ দিলে রুলস অব বিজনেস মানা হয় কি না, তা নিয়ে অবশ্য কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া ১৯৯৬ সালের রুলস অব বিজনেস সম্পর্কে দেখা যায়, এটি ২০১২ সালের জুলাইতে সর্বশেষ সংশোধিত হয়েছিল। এই রুলসের ৭ বিধির অধীনে চতুর্থ তফসিলে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাছে কী কী বিষয়ক নথি পেশ করতে হবে, সে ব্যাপারে একটি তালিকা দেওয়া আছে। ওই তালিকায় দেখা যায়, বিগত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রুলস অব বিজনেসে ৮ক, ৮খ ও ৮গ হিসেবে তিনটি দফা সংযোজন করা হয়েছে। ৮ক বলেছে, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের ১, ৫ ও ৬ উপদফার আওতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের নিয়োগ, পদত্যাগ ও চাকরির শর্তাবলি, ৮খ মতে ১১৮(৫) ও ৯৬(২) অনুচ্ছেদের আওতায় সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারদের অপসারণ এবং ৮গ মতে সংবিধানের ১২০ অনুচ্ছেদের আওতায় নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সরকারি কর্মচারী সরবরাহ করা সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করতে হবে। ২০০৮ সালের ২৫ নভেম্বর ৩১৯ নম্বর এসআরও জারি করার মাধ্যমে রুলস অব বিজনেসে ওই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই বিধানে উল্লিখিত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে নথিপত্র চালাচালির দায়িত্ব মন্ত্রিসভা বিভাগকে দেওয়া হয়েছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেন, আকবর আলি খান, জামিলুর রেজা চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত নাগরিক কমিটি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে রুলস অব বিজনেস সংশোধন করে নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করার বিষয়ে সুপারিশ করেছিলেন। জানতে চাইলে আকবর আলি খান গতকাল বলেন, কিছু বিষয় রয়েছে, যা সংবিধান সংশোধন ছাড়াই অর্জন করা সম্ভব। যেমন ডিসি-এসপি বদলি করতে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের কথা রুলস অব বিজনেসে বলা আছে। সেটা রুলস সংশোধন করলেই হলো। তবে তিনি মনে করেন, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবে না, সেটা ভবিষ্যতে আইনে স্পষ্ট করে লেখাই শোভনীয়।
এর আগে, ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের কাছে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তখন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রপতির দেওয়া আইন প্রণয়নের প্রস্তাবকে তাঁরা তাৎক্ষণিক স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু, আওয়ামী লীগ ওই আইন প্রণয়নের কোনো উদ্যোগই নেয়নি।
জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার গতকাল একমত হন যে রাষ্ট্রপতি এখন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে পারবেন কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়াই আসল প্রশ্ন। ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতির প্রথম পরিচয় তিনি প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং আমরা ধরে নেব, রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে পরামর্শ তিনি দিয়েছেন, তাতে তাঁর নিজের, দলের এবং মন্ত্রিসভার মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। এমনকি আইনমন্ত্রীও বলেছেন, আইন করার বিষয়ে তাঁরা রাষ্ট্রপতির দিকে তাকিয়ে আছেন। যদিও সাধারণভাবে সেটা থাকার কথা নয়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রুলস অব বিজনেসে যেহেতু ভিন্নতর বিধান আছে, তাই সরকারের উচিত হবে এর কার্যকরতার প্রশ্নে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা।
ড. বদিউল আলম মজুমদারও ওই অভিমতের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে বলেন, সরকার ও দলীয় প্রধানের দুটি সত্তা পৃথক করা যায় না। আর যেহেতু প্রধানমন্ত্রী একটি বিতর্কমুক্ত নির্বাচন করতে চান, তাই স্বচ্ছতার খাতিরে রাষ্ট্রপতি যাতে আইনগতভাবেও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে প্রতীয়মান হয়, তা স্পষ্ট করা সমীচীন হবে। প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন কোনো পরামর্শ দিয়ে থাকলেও তা-ও প্রকাশ করা উচিত।
আওয়ামী লীগের প্রস্তাবের দ্বিতীয় দফায় ‘রাষ্ট্রপতি যেরূপ উপযুক্ত বিবেচনা করবেন’, সেভাবে নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার সংবিধানগতভাবে রাষ্ট্রপতির নেই বলে কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারেন। যদিও রাষ্ট্রপতির অনুকূলে সংবিধানের ৪৮(৫) অনুচ্ছেদে একটি রক্ষাকবচ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নে কোনো তদন্ত করার এখতিয়ার আদালতের নেই।
তবে সার্বিক বিচারে আওয়ামী লীগের অবস্থানকে দৃশ্যত অনেক নমনীয় বলা যায়। তারা বলেছে, রাষ্ট্রপতির নেওয়া ‘যেকোনো ন্যায়সংগত উদ্যোগ’কে তারা সমর্থন দেবে। তারা উপযুক্ত আইন তৈরি বা অধ্যাদেশ জারির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে। কিন্তু সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের আওতায় কোনো অধ্যাদেশ জারি করতে হলেও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে। তারা বলেছে, সময়ের স্বল্পতায় তা সম্ভব না হলে পরের নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের সময় (২০২২ সালে) তেমনটা করা যেতে পারে। বর্তমান রাষ্ট্রপতির পাঁচ বছরের মেয়াদ অবশ্য শেষ হবে ২০১৮ সালে।
অনেকের মতে, আওয়ামী লীগ তার প্রস্তাবে নিয়োগপ্রক্রিয়া নির্দিষ্ট না করে এবং সার্চ কমিটির সদস্য বা নির্বাচন কমিশনের জন্য কোনো নাম প্রস্তাব না করে বরং ভালোই করেছে। কারণ, ক্ষমতাসীন দল হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলে সেটা উপেক্ষা করা রাষ্ট্রপতির পক্ষে কঠিন হতো। আওয়ামী লীগের প্রস্তাবের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নমনীয়তা। আইন প্রণয়ন, সার্চ কমিটি গঠন বা সমঝোতা—যেকোনো উপায়েই রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে এখন নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে পারেন। আর যদি তা না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে যে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে কার্যত রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেননি। তখন অবশ্য মানতেই হবে যে বলটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর কোর্টে।
রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া আওয়ামী লীগের প্রতিবেদনে ১১টি বিষয়কে ভালো নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে নির্বাচন পরিচালনায় ‘কেবলমাত্র প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের’ প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ এবং নির্বাচনকালে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন কমিশনের কাছে ন্যস্ত রাখার উল্লেখ আছে। তারা সুনির্দিষ্টভাবে বলেছে, বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবর্তে শুধু সরকারি কর্মকতা-কর্মচারীদের নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করতে হবে। আর রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োগ করতে পারবেন না। অবশ্য, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা প্রস্তাবে স্বীকার করেছে যে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের দেওয়া ২৩ দফার ভিত্তিতেই সেনা-সমর্থিত সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি তৈরি করেছিল।
একটি দলনিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের যে সুযোগ এখন রাষ্ট্রপতির সামনে হাজির হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি তার সদ্ব্যবহার করলে তা দেশের দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সম্ভাবনার পথ খুলে দেবে। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দলও রাজনৈতিক উদারতার একটি উদাহরণ তৈরি করতে পারে। আর, রুলস অব বিজনেস সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার আইনগত অধিকার শক্তিশালী করার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করতে পারেন।

LEAVE A REPLY