হরিজন সম্প্রদায়ের জীবনযাপন

পরিছন্নকর্মী এবং চা শ্রমিকহিসেবে ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় হরিজন বা দলিত সম্প্রদায়কে ১৮৩০ থেকে ১৮৫০ সালের দিকে তিন ধাপে ভারতের কানপুর তেলেগু থেকে এই শ্রমিকদের নিয়া আসা হয় সেই থেকেই এদের বসবাসের স্থান কলোনিতে বাংলাদেশে দুধরনের হরিজন বা দলিত সম্প্রদায় রয়েছে একদল স্থানীয় দলিত (ঋষি, জেলে, বেদে) এবং অন্যরা অভিবাসী দলিত (কানপুরি, মাদ্রাজি, তেলেগু চা শ্রমিক) অভিবাসী দলিতদের স্থায়ী কোনো বসবাসের স্থান নেই ব্রিটিশরা যখন বাংলাদেশে নিয়ে আসে তখন থেকে কলোনি পদ্ধতিতে অভিবাসী হরিজনদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়

ব্রিটিশ আমল থেকে সামাজিক বৈষম্যের কারণে হরিজন সম্প্রদায়ের কেউ কলোনির বাইরে বসবাস করতে পারছে না। তাদেরকে কেউ বাসা ভাড়া দেয় না। রাজধানীতে ১৭টি কলোনিতে হরিজন সম্প্রদায়ের বর্তমান সমাজ গড়ে উঠেছেহরিজন সম্প্রদায়ের বসবাসের জন্য ব্রিটিশ আমলে যেভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এখনও সেই অনুযায়ী হরিজনদের থাকতে হচ্ছে এমনটা জানান তেলেগু হরিজন সম্প্রদায়ের প্রধান লক্ষ্মী দাস।

হরিজন সম্প্রদায়ের সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করতেই ৬০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ বলেন, ‘হরিজন সম্প্রদায়ের প্রধান সমস্যা বাসস্থান। নিজেদের স্থায়ী বাসস্থানের জন্য লড়াই করতে করতে আজ বৃদ্ধ হয়ে গেছি। কিন্তু এখনও কিছু করতে পারলাম না।

থাকার জন্য একটা ছোট রুমে বরাদ্দ পেয়েছিলেন লক্ষ্মী দাসের বাবা। সেই রুমে লক্ষ্মী তার বাবা, মা স্ত্রী নিয়ে বসবাস করতেন। এরপর একই রুমে লক্ষ্মী তার দুই ছেলে ছেলের বউ এবং নিজের স্ত্রী নিয়ে বসবাস করেনবর্তমানে গাবতলী বেড়ীবাঁধ সিটি করপোরেশন কলোনিতে বসবাস করে তেলেগু হরিজন সম্প্রদায় তবে শুরু থেকে তারা মোহাম্মদপুরে বসবাস করতেন কিন্তু সেই জমি সিটি করপোরেশন দখলে নিয়ে তাদের উচ্ছেদ করে গাবতলী বেড়ীবাঁধে পাঠিয়ে দেয়

এই কলোনিতে হাজারের উপর রুম থাকলেও তেলেগু সম্প্রদায়ের জন্য মাত্র ৩৫টি রুম বরাদ্দ রয়েছে। এই ৩৫টি রুমে প্রায় উপর লোকের বসবাস। হরিজন সম্প্রদায়ের একাধিক কলোনিতে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সম্প্রদায়ের প্রধান সমস্যা স্থায়ী কোনো বসবাসের স্থান না থাকা।  ব্রিটিশ আমলে বরাদ্দ পাওয়া একটি রুমে বর্তমানে ১০ থেকে ১২ জনের অধিক মানুষকে বসবাস করতে হচ্ছে বলে জানান তেলেগু সমাজের প্রধানের স্ত্রী পার্বতী

তিনি জানান, ছেলে বিয়ে দিয়ে নতুন বউ নিয়ে এক ঘরে থাকতে হয় তাদের ১৫ ফুটের একটা বাসার মধ্যে পর্দা দিয়ে ছেলে ছেলের বউ বাসর ঘরে যায়হরিজন সম্প্রদায়ের বসবাসের ব্যবস্থার বিষয়ে অধিকাংশ নারীর মন্তব্য হলো, ‘পশুর থেকেও খারাপ ভাবে তাদের বসবাস করতে হচ্ছে।ছেলেমেয়ে, তারপর ছেলের বউ, মেয়ের জামাই। সবাইকে নিয়ে একটা রুমের মধ্যে রাতে ঘুমাতে হয়। এমন খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে এই সম্প্রদায়ের লোকরা বছরের পর বছর পার করছেন। আর তাদের এই কষ্ট কেউ বোঝে না। খুব আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন সায়মান

তিনি বলেন, ‘আমরা ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়ছি। কিন্তু ভালোভাবে বাঁচার অধিকার পাইনি। ব্রিটিশ আমলে আমার বাবার দাদা যে একটা রুম বরাদ্দ পেয়েছিলেন সেই রুমে আমি, আমার ভাই, আমার ভাইয়ের বউ, আমার বউ, আমাদের দুই ভাইয়ের ছয় ছেলেমেয়ে এক সাথে বসবাস করি।

হরিজন সম্প্রদায়কে কেউ বাসা ভাড়া দেয় না আর সরকার আমাদের জন্য অনেক কিছু করবে বলে ভোটের সময় নানা কথা বলেন এরপর ভুলে যায় ছোট জাতের বলে কেউ বাসা ভাড়া দেয় না আমাদের পশুর মতো এক রুমে মা ছেলে মেয়ে বাবা ঘুমায় আমরা মেথরের কাজ করি আমাদের মতো অনেক মুসলমান এই কাজ করে কিন্তু তাদের বাসাভাড়া দেয়, আমাদের দেয় না’— গণকটুলি কলোনির কানপুরি সম্প্রদায়ের চন্দন ক্ষোভের সঙ্গে এমন কথা বলেন

হরিজন সম্প্রদায়ের কলোনির সামনে জামা কাপড় রোদে দেওয়ার দৃশ্য দেখলে বোঝা যায় একটা কলোনিতে কতো লোক বসবাস করেছয়টি রুমের জন্য একটা বাথরুম। তবে প্রতিটি রুমে কম হলেও ১০ জনের উপর লোকের বসবাস। এছাড়া কলোনিতে নেই গ্যাস, পানি। টিউবয়েল বসিয়ে পানির সংস্থান করতে হয়। এছাড়া সেই ব্রিটিশ আমলের বিল্ডিংয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। আর সেই সকল ভবনের অধিকাংশকে ঝুকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। তবুও এই সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে না। ঝুকিপূর্ণ ভবন থেকে তাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না

হরিজন সম্প্রদায়ের তেলেগু ডেভিট বলেন, ‘আমরা চাই নিজস্ব একটা থাকার স্থান আমরা প্রতিনিয়ত ভয়ে থাকি কখন আমাদের এসে উচ্ছেদ করে দেয় আমাদের প্রধান সমস্যা বাসস্থান

বাংলাদেশে বর্তমানে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ। ঢাকায় আছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার। ঢাকায় ১৭টি কলোনিতে হরিজন সম্প্রদায়ের লোকরা বসবাস করেন। এদের মধ্যে দুটি ভাগ আছে। একটি হলো কানপুরি অন্যটি হলো তেলেগু। কানপুরিদের ভাষা হিন্দী মিশ্রিত। আর মাদারাজি বা তেলেগুরা তেলেগু ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা বলেন পরিবর্তন

LEAVE A REPLY