সাত খুন মামলায় ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড

অনলাইন ডেস্ক : নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলায় নূর হোসেনসহ ২৬ জনের মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ শহরের কাছ থেকে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে হত্যার অপরাধে আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। সোমবার নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার সময় মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা ২৩ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন র‍্যাবের সদস্য। মামলার শুরু থেকেই র‍্যাবের সাবেক ৮ সদস্যসহ ১২ আসামি পলাতক।

সাত খুনের মামলায় মোট ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তাঁরা হলেন চাকরিচ্যুত লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা, হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দ বালা, করপোরাল রুহুল আমিন, এএসআই বজলুর রহমান, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, সৈনিক নুরুজ্জামান, কনস্টেবল বাবুল হাসান ও সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর। কারাগারে থাকা বাকি আসামিরা হলেন সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, তাঁর সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী, আবুল বাশার ও মোর্তুজা জামান (চার্চিল)।

পলাতক আসামিরা হলেন করপোরাল মোখলেছুর রহমান, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবীর, এএসআই কামাল হোসেন, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান এবং নূর হোসেনের সহযোগী সেলিম, সানাউল্লাহ ছানা, ম্যানেজার শাহজাহান ও ম্যানেজার জামাল উদ্দিন।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড : ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ তার পাঁচ সহযোগীকে অপহরণ করা হয়। একই সময় একই স্থান থেকে অপর একটি গাড়িতে থাকা নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রবীণ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়ির চালককেও অপহরণ করা হয়। ঘটনার তিনদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দর উপজেলা শান্তির চর এলাকার তীর থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

অপহরণের পর থেকে নজরুলের স্বজন এবং এলাকাবাসী আন্দোলন শুরু করে। আর লাশ উদ্ধারের পর থেকে আন্দোল আরো তীব্র হতে থাকে। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন প্রবীণ আইনজীবী চন্দন সরকার নিহত হওয়ায় রাজপথ থেকে আদালত অঙ্গন পর্যন্ত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

এই অপহরণ আর সাতজনকে খুন গুমের নেপথ্যে তৎকালীন সিটি কর্পোরেশনের ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিদ্ধিরগঞ্জের ডন নূর হোসেন, র‌্যাব-১১’র সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদসহ র‌্যাবের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি চলে আসে নারায়ণগঞ্জের দিকে।

অপহরণের নির্দেশদাতা নূর হোসেনের ভারতে পলায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী এক সংসদ সদস্যের জড়িত থাকার মোবাইল কথোপকথন গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর আরো বেশী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। একজন কাউন্সিলরের নির্দেশে কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মেয়ের জামাই তারেক সাঈদ তার নি¤œপদস্থ র‌্যাব কর্মকর্তারা খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে এমন বিষয়টি প্রকাশ পায়।

সাত খুনের ঘটনার সাথে জড়িত আসামীদের সাথে সখ্যতা থাকার অভিযোগে তৎকালীন র‌্যাবের এডিজি কর্নেল জিয়াউল হক, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানসহ হেভিওয়েট অনেককেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্তের কমিটির মুখোমুখি হতে হয়।

এরপর সাত খুন মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনের ভারতে অনুপ্রবেশের দায়ে গ্রেফতার হওয়া, এরপর বাংলাদেশে তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারকার্য সম্পন্ন করাকালীন সময়জুড়ে দেশজুড়ে বেশ আলোচিত হয়ে উঠে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি। মামলায় ৩৫ জন আসামীর মধ্যে ২৩ জন গ্রেফতার থাকলেও বাকী ১২ জনকে পলাতক দেখিয়েই সাক্ষ্য ও জেরার পর গত ৩০ নবেম্বর যুক্তিতর্ক শেষ হয়। সাত খুনের ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের হলেও ১২৭ জনকে অভিন্ন সাক্ষী করা হয়। যার মধ্যে ১০৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY