কবিতা গুচ্ছ

মানবিক মারণাস্ত্র

তুমি জন্মেছো বাংলায়, তুমি তাই বাদামী, দরিদ্র, বাঙালী
তুমি জন্মেছো আফ্রিকায়, তুমি তাই কাল, নিগৃহীত, আফ্রিকান

তুমি জন্মেছো লাতিন আমেরিকায়, তুমি তাই ধর্ষক, অনুপ্রবেশকারী, হিস্পানিক
তুমি জন্মেছো মধ্যপ্রাচ্যে, তুমি তাই সাম্প্রদায়িক, অবাঞ্ছিত, আরব
তুমি জন্মেছো রাখাইনে, তুমি তাই মূল্যহীন গোত্র, কীটপতঙ্গ, রোহিঙ্গা
তোমাদের নিয়ে কেউ মুর্ছনা গায় না, কেউ উচ্চকিত হয় না;
পৃথিবীর মানবাধিকার শরণার্থী হয়, অজস্র লাশ নদীতে বিমূর্ত হয়ে ভাসে!

তুমি জন্মেছো আদি যুক্তরাজ্যে, তুমি তাই সাদা, অধিপতি, ইংলিশ
তুমি জন্মেছো মার্কিন মুল্লুকে, তুমি তাই প্রভু, শ্রেষ্ঠত্ববাদী!
আমাদের উলঙ্গ মূল্যবোধ শ্রেণী বৈষম্যে লুঠতরাজ হয়ে যায়
আটকা পড়ে যায় সীমানা প্রাচীর আর কাঁটাতারের বেড়ায়;
এই গাঢ় অন্ধকার কোথা পবে সূর্যোদয়, কে ছড়াবে সমতার উত্তাপ।

তুমি জন্মেছো ধর্মচারী পিতামাতার কোলজুড়ে, তুমি তাই মুসলিম, খ্রীষ্টান, হিন্দু অথবা বৌদ্ধ;
তুমি জন্মেছো ছোট্ট কুঁড়েঘরে, তুমি তাই শোষিত, গরীব; ঘরের পাশে দেয়ালে বসে থাকা দাঁড়কাক।

তুমি জন্মেছো শহরের অভিজাত দালানে, তুমি তাই সমাজপতি, এলিট; চারপাশে পূজনীয় স্ট্যাচু
আমরা জন্মেছি এই পৃথিবীর পথে প্রান্তরে, আমাদের কি আখ্যা দিবে তোমরা;
বিভেদকারীরা বলে এ কোন নির্বোধ বিপ্লবীর মিছিল
অথচ দেখো চারপাশে সু-সময়ের দমকা হাওয়া বইছে, মানুষে মানুষে বাড়ছে মহামায়ার বন্ধন।

চারিদিকে পৃথিবীর সব মারণাস্ত্র ফুটে জন্ম নিচ্ছে লাখো লাখো বিপ্লবী স্বপ্ন
পৃথিবীর ভয়ংকর সব আনবিক অস্ত্র হয়ে উঠছে একেকটি বিশ্বশান্তির সুললিত সঙ্গীত
দেশে দেশে সীমান্ত আর কাঁটাতারের বেড়া তছনছ হয়ে যাচ্ছে ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে

পুঁতে রাখা মাইন মিলিয়ে যাচ্ছে মাটিতে, সব মানুষ ফিরে পাচ্ছে তার সবুজ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড
সমস্ত শহরে রাস্তার পর রাস্তা রঙিন হয়ে উঠছে শিউলি আর চেরী ফুলে

জগতের সব সুবর্ণ হাত মিলে যাচ্ছে কাল হাতে
আমাদের সম্মিলিত ভালবাসার টানে, উজানমুখো হবে পৃথিবী একদিন!

 

একগাদা ভুল

জীবনের সবকিছু ভরে যায় একগাদা ভুলে
আমাদের দিনগুলি বেজে উঠে ভুলের গল্পে
আজ সারা শহরে ভরা বৃষ্টি, বৃষ্টির ভুল করা আবেদন

চলো ভুনা খিচুড়ি আর সর্ষে ইলিশ, থাকবে শুধু সময় ভর্তি শিহরণ
সাথে একটানা ক্লাসিক সিনেমা, কড়া লিকারে চা, চিনাবাদাম
খোলা উঠোনে ভেজা তুমি-আমি, কদম ফুল, দেবদারু, মায়ামী পাম

অবাধ্য প্রেমিক তোমার কালো খোঁপায় গোলাপের গন্ধ পায়
তোমার বুকের ওমে বৃষ্টির সুর, দিন পরে থাকে নকশী কাঁথায়
অথই শিহরণ ঢালে মৌমাছি, এক খানা সুখের ঘর টলমলায়

চোখে সোনালী স্বপ্ন বাঁধে বোকা নারী, মুখ আলো ছড়ায় স্নিগ্ধতায়
জীবনের সবকিছু ভরে যায় এক গাদা ভুলে
তুমি উন্মাতাল, আচ্ছন্নতায় কাক ভেজা, জীবনের প্রথম চুম্বনকে আঁকে

ভাসতে ভাসতে অচেনা নদীর পাড়ে, এপার আর ওপার জুড়ে দীর্ঘশ্বাস
মনে আর মাথায় ভনভন করে ভুল আর ভুল, বাকী থাকে শুধু হাঁসফাঁস।
চলছে চলুক

চারপাশের সবিকছু ভেঙে যায় অমানবিক ভুলে
মানুষে মানুষে বাড়ছে স্বার্থের ভুল

রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বাড়ছে কাঁটাতারের ভুল
জাতিতে জাতিতে মারণাস্ত্র আর দ্বন্দ্ব সংঘাতের সমারোহ
রাজনীতি দূষিত কদর্মাক্ত ভুলে

ধর্ম, বর্ণ, সীমানা নিয়ে চলছে অসহিষ্ণুতার ভুল
বিশ্বায়ন নিয়ে পুড়ছে সবাই উদ্বেগ আর অনিশ্চিত ভুলে
পরিবার পরিবারে মিটছে না অহেতুক ভুল

বন্ধুর বন্ধুতায় অন্ধকার ভুল
চারপাশের সবকিছু কেবলই ডুবে যায় প্রাচুর্যের ভুলে।

জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে কাটছে না সংশয়-ভুল
মানুষের ক্রমশঃ হিম শীতল হয়ে যাবার ভুল

জীবন ‘চলছে চলুক’- কোন কিছুতে ভ্রুক্ষেপ না থাকার ভুল
তোমার হাতের স্পর্শে মায়াময় ভুল

তোমার গালভরা প্রতিশ্রুতিতে দেখছি ভুলের সমাহার
ভুলে ভুলে কি ভুল শপথে ঝুলতে থাকবে আমাদের সারা জীবন !     [  পরিবর্তন]

LEAVE A REPLY