কিশোর অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে

চুরি-ছিনতাই বা ঘর পালানোর মতো অপরাধ পেছনে ফেলে কিশোরদের খুন-ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। দেশের দুই কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সেখানে থাকা কিশোরদের ২০ শতাংশ খুনের মামলার আর ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলোর বেশির ভাগই ধর্ষণের অভিযোগে করা।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিশোর অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে। বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে আসা এসব কিশোরের মধ্যে দরিদ্র পরিবারের সন্তান যেমন আছে, তেমনি আছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানও। বিভিন্ন গবেষণায় এসেছে, ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সীরা অপরাধে বেশি জড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, ৯ থেকে অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের কোনো ছেলেশিশু অপরাধে জড়ালে তাদের গাজীপুরের টঙ্গী ও যশোরের পুলেরহাটের কিশোর (বালক) উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়। এই দুটি কেন্দ্র থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরে সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য পাঠানো হয় গত ৩১ ডিসেম্বর। ওই দিন কেন্দ্র দুটিতে ছিল ৫৯৭ জন কিশোর। তাদের মধ্যে ১২০ জন হত্যা মামলার আসামি। ১৪২ জন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা মামলা এবং ৯ জন তথ্যপ্রযুক্তি ও পর্নোগ্রাফি আইনে করা মামলার আসামি। এর বাইরে চুরির মামলায় ৮৯, ডাকাতি ১৬, ছিনতাই ৬, মাদক মামলায় ৬৬, অস্ত্র মামলায় ২০ ও বিস্ফোরক মামলায় আছে ৫ জন। অন্যরা সাধারণ ডায়েরিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শেখ তৌহীদুল ইসলাম বলেন, কিশোর অপরাধীদের মধ্যে এখন তিনটি শ্রেণি আছে। তাঁর মতে, বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের পরিবারের কিশোরেরা দারিদ্র্যের কারণে, মফস্বল থেকে বড় শহরে আসা কিশোরেরা সমাজে টিকে থাকার জন্য এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে।

কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র
৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন মামলার আসামি ৫৯৭ জন
*নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ১৪২ *খুনের মামলায় ১২০ *চুরির মামলায় ৮৯ *ডাকাতির মামলায় ১৬ *মাদক মামলায় ৬৬ *অস্ত্র মামলায় ২০ *অন্যান্য ১৪৪

চলতি বছরের শুরুতে কিশোর অপরাধের আলোচিত ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর উত্তরায়। সেখানকার কিশোরদের দুই দলের বিরোধের জেরে ৬ জানুয়ারি খুন হয় নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবীর। এ ঘটনার ১২ দিনের মাথায় তেজগাঁওয়ের তেজকুনীপাড়ায় ‘কে বড়, কে ছোট’ এ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে খুন হয় আবদুল আজিজ নামে এক কিশোর। এ দুটি ঘটনার মধ্যে ১৫ জানুয়ারি রূপনগরে এক স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে আহত করে একদল কিশোর।
এ ছাড়া গত বছরের ১৪ মে রাজধানীর ভাষানটেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ওই ঘটনায় ১৪ বছরের এক কিশোরকে আটক করে পুলিশ।
টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা (৩১ ডিসেম্বর) ৩৮৪ জন কিশোরের মধ্যে ৮১ জন নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। এদের বেশির ভাগই ধর্ষণ মামলার আসামি বলে জানান ওই কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. শাহ জাহান। এর বাইরে শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা ও উত্ত্যক্ত করা মামলার আসামিও আছে।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকেরা বলছেন, আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, আকাশ সংস্কৃতি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বা তথ্যপ্রযুক্তি কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সামাজিক মনোচিকিৎসা বিভাগের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তির ভালো-মন্দ দুই দিকই আছে। কিশোরেরা ইন্টারনেট সংযোগসহ মুঠোফোন ব্যবহার করছে। তারা যা দেখছে বাস্তবে তা ঘটিয়ে বসছে। তাঁর মতে, নিয়ম হওয়া উচিত ছিল, কিশোরেরা ইন্টারনেট সংযোগ নেই এমন বেসিক ফোন ব্যবহার করবে এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ই-মেইল আইডি ও পাসওয়ার্ড অভিভাবকেরা জানবেন। সে কাজটি হচ্ছে না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শিল্পী রানী দে কিশোর অপরাধ নিয়ে ২০১৫ সালে গবেষণা করেন। তাতে তিনি ১৯৯০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কিশোর অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাতে দেখা যায়, ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে রাজধানী ঢাকায় মোট কিশোর অপরাধের মামলা ছিল ৩ হাজার ৫০১টি। এর মধ্যে ৮২টি হত্যা ও ৮৭টি নারী নির্যাতনের মামলা ছিল। পরের ১০ বছরে এ দুই ধরনের মামলার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৩৮ ও ২২৪। এই ১০ বছরে (২০০১-১০) মোট মামলা হয় ৪ হাজার ৮৮২টি।
বছর অনুসারে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০১ সালে ঢাকায় কিশোর অপরাধের মামলা ছিল ৫১২টি। এর মধ্যে চুরির ঘটনা ছিল ১৩৮, হত্যা মামলা ১৪ ও নারী নির্যাতন ১৮টি। পাঁচ বছর পর ২০০৬ সালে এসে মোট মামলা তেমন বাড়েনি। কিন্তু খুন ও নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ ও ২২-এ। আর চুরির মামলা কমে যায় (১১৩টি)। ২০০৬ সালে মোট মামলা ছিল ৫২৮টি।
২০১২ সালে এসে কিশোর অপরাধের মামলা কমে দাঁড়ায় ৪৮৫টিতে। কিন্তু হত্যা ও নারী নির্যাতনের মামলা আরও বেড়ে যায়। হত্যা ১৭টি ও নারী নির্যাতন মামলা ৩৮টি। আর চুরির মামলা হয় ৮৫টি।
শিল্পী রানী দে জানান, একটি কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার্স কল্যাণ সমিতি এসব তথ্য সংগ্রহ করেছিল। কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০১২ সালের পর এ-সংক্রান্ত আর হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশে ৪৩ বছর চাকরি করে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া সিআইডির জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবীর বলেন, একটা সময় ছিল হরতালের আগের দিন সন্ধ্যায় পথশিশুকে ধরে থানায় নিয়ে যাওয়া হতো। কারণ, সামান্য টাকার বিনিময়ে তারা হরতালে মিছিলের সামনে থাকত, মারামারি লাগলে ইটপাটকেল, বোমা ছুড়ত। এ ধরনের শিশুদের মাদক বহনসহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত করা হতো। কিন্তু এখন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেরাও নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। পরিবার, চারপাশের পরিমণ্ডল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুশাসন নেই। ছেলে কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে, তার খোঁজ মা-বাবা রাখতে পারছেন না। প্রযুক্তি তাদের জীবনাচরণকে পাল্টে দিচ্ছে। পাশের বাড়ির ছেলেটির নতুন মোটরসাইকেল দেখে কিশোর ছেলেটির পরিবারও তার চেয়ে দামি কিছু কিনতে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামছে। কিশোরদের ওপর এর মারাত্মক বাজে প্রভাব পড়ছে।
গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরে নতুন মডেলের মোটরসাইকেল না পেয়ে ১৭ বছরের কিশোর ছেলে তার বাবা ও মায়ের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। মা বেঁচে গেলেও বাবা এ টি এম রফিকুল হুদা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) মো. জুলফিকার হায়দার বলেন, অনেক মা-বাবা আছেন, সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, ইন্টারনেটে কী দেখছে সে সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না। মনে করেন টাকা দিলেই সব দায়িত্ব শেষ। যাঁরা এমন মনে করেন, তাঁদের সন্তানদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

LEAVE A REPLY