প্রাণবন্ত হোক আমাদের মসজিদগুলো

বিশ্ব মুসলমানের ঈমানী সম্মেলন টঙ্গীর ইজতেমা শেষ হয়ে গেল। দু’পর্বে অনুষ্ঠিত এ বছরের ইজতেমা শেষ হয়েছে ২২ জানুয়ারি। নিছক কোনো বেখেয়ালে এত বড় ইজতেমার আয়োজন করা হয় না। বরং বিশ্বের প্রতিটি মানুষ উভয় জগতের চিরস্থায়ী শান্তি ও মুক্তির পথে নিজে অবিচল থেকে অন্যকে কীভাবে আহ্বান জানাতে পারে, এ প্রেরণা সৃষ্টির লক্ষ্যেই ইজতেমার আয়োজন। তাই ইজতেমাকে প্রথাগত কোনো মোনাজাতের অনুষ্ঠান না মনে করে এর মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বোঝা খুব জরুরি। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবারের ইজতেমার আমেজ ছিল খানিকটা ভিন্ন। বর্তমান প্রচলিত তাবলিগের এ ধারাটি শুরু হয়েছে হজরত মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.)-এর মাধ্যমে। তার ইন্তেকালের পর পর্যায়ক্রমে এ জামাতের হাল ধরেন তার সুযোগ্য সন্তান মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী (রহ.) ও মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.)। মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.) ১৯৯৯ সালে ইন্তেকালের পর এককভাবে তাবলিগের আমির নির্ধারণ না করে তিনজন শূরার মাধ্যমে এতদিন কাজ পরিচালিত হচ্ছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল হজরতজী ইলিয়াস (রহ.)-এর খান্দানের যিনি ছিলেন, তার বয়স তখন মাত্র ত্রিশের কোটা পার হয়েছিল। তাই বিশ্বব্যাপী পরিচালিত এ কাজের সুবিধার্থে তখনই তাকে আমীর বানানো হয়নি। এরই মাঝে দু’জন শূরা ইন্তেকাল করেন। ফলশ্রুতিতে তাবলিগ জামাতের পুরো জিম্মাদারি এখন হজরতজীর ৪র্থ পুরুষ মাওলানা সাদ কান্ধলভীর ওপর অর্পিত হয়েছে। বিগত ১৫ বছর ধরে ইজতেমার মূল একটি বয়ান ও শেষ দিক নির্দেশনামূলক বয়ান তিনিই করে আসছিলেন। দীর্ঘদিন আখেরি মোনাজাত পরিচালনাকারী মাওলানা জুবাইরুল হাসান (রহ.) ২০১৪ সালে ইন্তেকালের পর থেকে গত দু’বছর মাওলানা সাদ আখেরি মোনাজাতও পরিচালনা শুরু করেন। এ বছর বিশ্ব ইজতেমা পুরোপুরি মাওলানা সাদ কান্ধলভীর পরিচালনায় সম্পন্ন হয়। বিশাল জুমার খুতবা তিনি প্রদান করেন। দীর্ঘদিন পর হজরতজীর বংশধরদের মাধ্যমে নতুন উদ্যমে ইজতেমা সম্পন্ন হওয়ায় অনেক সাথীর উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল ব্যাপক। গত শুক্রবার বাদ মাগরিব বয়ানের শুরুতে মাওলানা সাদ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা বলেন। তিনি বলেন, আমাদের জন্য চিন্তা করা উচিত যে, দুনিয়াতে দ্বীনের ব্যাপক প্রচার-প্রসার থাকা সত্ত্বেও এত উদাসীনতা কেন? জেহালত কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে? ইলমের এত চর্চা থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন নিরাশ হয়ে যাচ্ছে! কেন আমলের ওপর চলতে পারছে না সবাই! দ্বীনের মধ্যে মোয়ামালাত-মোয়াসারাত তথা লেনদেন ইত্যাদির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে কেন? মানুষের মধ্য থেকে দ্বীনের এস্তেকামাত কেন বের হয়ে যাচ্ছে! যা দ্বীনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে! হজরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) বলেছেন, শরীর থেকে কাপড় খোলা বা বদলে দেয়ার মতো দ্বীনকেও মানুষ বদলে দিচ্ছে। কুফুরি ইরতেদাদ দ্রুত দ্বীনকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে। এর কারণ কী? আগে কারণ খুঁজে বের করতে হবে আমাদের। এর একমাত্র কারণ হল দ্বীনের মেহনতকে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করিনি। ফলে দ্বীনের প্রতি আমাদের স্বভাবজাত ভালোবাসা সৃষ্টি হয়নি। তাই দ্বীনের কোনো ক্ষতি আমাদের ব্যথিত করে না।

মোহতারাম দোস্ত বুজুর্গ! অথচ সাহাবাদের দাওয়াত ছিল একশ’ ভাগ নিজের জান-মালকে খরচ করে। আর তখন দলে দলে মানুষ দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করছিল। আজ মানুষ গোনাহ করে আফসোস করছে না। এর একটাই কারণ কয়েক রকমের যোগ্যতার পর সব ধরনের জ্ঞান ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা দ্বীনের মধ্যে জান-মাল সময় ক্ষমতা বিদ্যা ব্যয় করছে না। আর মানুষের স্বভাব হল, সে যাকে ভালোবাসে তার ক্ষতি সহ্য করতে পারে না। যেমন দোকানির দোকান, বাদশার বাদশাহী, কৃষকের ফসল ইত্যাদি। কারণ পাঁচটি জিনিস বেখেয়ালে খরচ হচ্ছে। এক. জান, দুই. মাল, তিন. সময়, চার. ক্ষমতা, পাঁচ. বিদ্যা। আমাদের এ পাঁচটি জিনিস দ্বীনের জন্য ব্যবহার হয়নি। দ্বীন আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া তাই এসব জিনিস খরচের ক্ষতির আফসোস আসছে না। পেরেশানি পয়দা হচ্ছে না। মানুষ তার সহজাত স্বভাবের বাইরে যেতে পারে না। আর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছিলেন এর বিপরীত। তারা দ্বীনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই পাঁচ জিনিসকে ব্যবহার করেছেন বিধায় দ্বীন দুনিয়াতে চমকে গেছে। তখন দ্বীন থেকে বের হওয়ার দরজাও বন্ধ হয়ে গেছে।

ইজতেমার শেষ হেদায়াতের (দিকনির্দেশনামূলক) বয়ানে তাবলিগ জামাতের বর্তমান হজরতজী মাওলানা সাদ (দা.বা.) কয়েকটি বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেছেন। বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতের আগে যে হেদায়াতি বয়ান হয়, সে বয়ানে মূলত দাওয়াতের কাজ ও আনুষাঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে। এ নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সফল হতে পারে বিশ্ব ইজতেমার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। যেমন ঈমান ও নামাজ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা শেষে মাওলানা সাদ (দা.বা.) ইলম তথা জ্ঞানের প্রতি আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, মুসলমানদের তো ইলম শিক্ষা করা ফরজে আইন। জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান হল কোরআনের ইলম। আজ আমরা তা শেখা ছেড়ে দিয়েছি। আর যতটুকু শিখছি, পুরুষরাই শিখছি। নারীদের শেখানোর প্রয়োজনও অনুভব করি না। অথচ নারী-পুরুষ সবার ওপর কোরআন শেখা আবশ্যক। এ জন্য তিনি বলেন, প্রতিদিন ঘরে পরিবারের সবাই কোরআন শিখতে হবে। এবং এতে মহিলাদেরও অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে। এর পাশাপাশি তিনি তাবলিগ জামাতের সাথীদের নিজ নিজ এলাকায় কোরআনি মক্তব প্রতিষ্ঠার আদেশ প্রদান করেন। এ কোরআনি মক্তবে শুধু বাচ্চাদেরই নয়, বয়স্কসহ সর্বশ্রেণীর মানুষের কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করার আদেশ জারি করেন। হজরতজীর এ কথাগুলো অত্যন্ত বাস্তব ও সময়োপযোগী। যদি আমাদের তাবলিগের সাথী ভাইয়েরা হজরতজীর এ আদেশটি পালনে সচেষ্ট হন, তাহলে এ দেশের কোটি মানুষ কোরআনের আলোয় আলোকিত হবে। কোরআনের ঐশী নূর ছড়িয়ে পড়বে সমাজের সর্বত্র। দূর হয়ে যাবে সব কালো ও অন্ধকার। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এত উৎকর্ষতা সত্ত্বেও মানবিকতার যে সংকট বিরাজ করছে, মানবাত্মা হাহাকার করছে যার শূন্যতার, তা একমাত্র কোরআনের আলোতেই পূর্ণতা পেতে পারে। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই হযরতজী এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। এরপর তিনি মসজিদ আবাদের ব্যাপারে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে যারা ঈমান আনে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিবসের প্রতি এবং কায়েম করেছে নামাজ ও আদায় করে জাকাত, আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করে না। (সূরা তওবা-১৮) বিশ্বের সবক’টি দেশের তাবলিগের শূরা সদস্যদের তিনি বলেন, শুধু ভারত বাংলাদেশ নয়, প্রত্যেক দেশের সব মসজিদ কীভাবে ২৪ ঘণ্টা আবাদ করা যায়, তা আপনারা এখানেই সিদ্ধান্ত করে যাবেন। আসলে রাসূল (সা.)-এর যুগসহ ইসলামের স্বর্ণযুগে মসজিদই ছিল মুসলমানদের প্রতিটি কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু। আজকে মসজিদে শুধু নামাজ পড়ে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়। আমাদের মসজিদগুলো আজ নির্জীব, প্রাণহীন। অথচ রাসূল (সা.)-এর মসজিদ ছিল সজীব ও প্রাণবন্ত। তাই মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র মসজিদগুলো যদি আবার প্রাণবন্ত হয়, তা হলে আবার ঘুরে দাঁড়াবে বিশ্ব মুসলিম। এরপর তিনি জিম্মাদারির গুরুত্ব সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করেন। তিনি বলেন, অনেক কাজ করেও এ কথা ভাবার অবকাশ নেই যে, আমি অনেক কিছু করেছি। কারণ জিম্মাদারি তো তখন আদায় হবে, যখন দ্বীনের দাওয়াতরত অবস্থায় আমার ইন্তিকাল হবে। আর যে কোনো মেহনতের জন্য অপরিহার্য হল, তার জন্য কোরবানি করা। কোরবানির সেই স্তর আমাদের পার করতে হবে, যে স্তরে আল্লাহ হেদায়াতের ফায়সালা রেখেছেন।
সূত্র: যুগান্তর

LEAVE A REPLY