শাড়ি-পাঞ্জাবিতে উচ্ছল বাঙালির ‘প্রেমদিবস’

Lifestyle: আইসক্রিম খেতে গিয়ে পড়ে গিয়েছে আনকোরা পাঞ্জাবিটায়। দাগ ধরার আগেই অগোছালো আঁচল দিয়ে তড়িঘড়ি মুছিয়ে দিল চুড়ি-পরা হাত।

নিজস্বীতে বাদ পড়ে গিয়েছে মেয়েটির ডান কানের দুলের শেষ প্রান্তটা। ধমক খেয়ে মুখ কাঁচুমাচু আনাড়ি ছেলেটার।
আরে, ছোট মামা না! মুখটা ঘোরাও শিগ্গির অন্য দিকে — পাও ভাজির স্বাদ ছেড়ে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্যে মগ্ন হল যুগল।

ময়দান থেকে মোহর কুঞ্জ, ইকো পার্ক থেকে ইলিয়ট পার্ক— বুধবার সরস্বতী পুজোর দিনে শহরের আনাচকানাচ ভরে থাকল এমনই টুকরো টুকরো দৃশ্যপটে। শহর জুড়ে প্রেমের মরসুমে মেতে উঠল
বাঙালি যুগলেরা। যতই থাক ভ্যালেন্টাইনস ডে বা দুর্গাপুজো। প্রেম করার জন্য সরস্বতী পুজোর দিনটার সঙ্গে কোনও কিছুর যেন তুলনা হয় না। প্রেমিকার দিকে তাকিয়ে বললেন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র অনীক। পাশ থেকে প্রেমিকা, অনীকেরই ক্লাসমেট হৈমন্তী মনে করিয়ে দিলেন, সাত বছরের প্রেমে কোনও দিন ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে একসঙ্গে বেরোননি তাঁরা। বললেন, ওই দেখনদারি ফুল-টেডি-ক্যাডবেরি ভাল লাগে না আমাদের। ভাল রোজ বাসি, এই পুজোর দিনে ওকে পাঞ্জাবি পরে দেখতে ‘স্পেশ্যাল’ লাগে। আর নতুন শাড়িতে চেনা প্রেমিকাও যে এই একটা দিনে অনন্যা হয়ে ওঠেন, বলতে গিয়ে লজ্জায় হেসেই ফেললেন অনীক।

জয়িতা-স্বর্ণাভর দু’বছরের কলেজ-প্রেম অবশ্য এখনও গোপন। দু’জনের কলেজ, টিউশন সব এক হলেও বাড়িতে বললে মোটেই ছাড় মিলবে না আলাদা করে দেখা করার বা ঘোরার। কলেজপড়ুয়া যুগল জানালেন, এই একটা দিনই পড়াশোনার ব্যাপার থাকে না, বাড়ির নজরদারিও অনেক আলগা হয়। কলেজে পুজোর নাম করেই সেজেগুজে বেরোনো হয়। আর পুজো সেরেই চোখে চোখ-হাতে হাত, পায়ে পায়ে প্রিন্সেপ ঘাট।

এ দিন শেষ দুপুরে প্রিন্সেপ ঘাটে পৌঁছেই মনে হতে পারে গণ-বিবাহের মতোই গণ-প্রেমের কোনও অনুষ্ঠান চলছে। উজ্জ্বল শাড়ি আর রঙিন পাঞ্জাবির ভিড়ে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। প্রতিটি বেঞ্চে গায়ে গা ঘেঁষে বসে দু’-তিনটি করে যুগল। তাঁদেরই
এক জন চন্দ্রিমা। সাফ বললেন, এ ছাড়া উপায় কী! এই একটা দিন না বেরোলে প্রেমের মান থাকে নাকি! হোক ভিড়, প্রেমও হোক চুটিয়ে।

কিন্তু কেন? প্রেমের কৌলীন্য বজায় রাখতে এই দিনের মাহাত্ম্যটা কী রকম?

ময়দানে বসে বছর পঁয়ত্রিশের সৌমিক লাহিড়ি হেসে বললেন, প্রেম তো সারা বছরই। কিন্তু এই দিনটার প্রেমে যেন অনেকটা ছোটবেলা মিশে থাকে। দশ বছরের বিবাহিত জীবনের আগে সৌমিকের আরও দশ বছরের প্রেম ছিল অন্তরার সঙ্গে। আর সেই মোবাইল-বিহীন প্রেম-জীবনে চাতকের মতো অপেক্ষা থাকত এই দিনটার। অন্তরা জানালেন, সরস্বতী পুজোর দিনেই স্কুলের গেটে সাইকেলে হেলান দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টি দিয়ে শুরু হয়েছিল ভীরু প্রেম। তার পর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাতপাকে বাঁধা পড়তে বহু ঝড় পেরিয়েছিল তাঁদের সম্পর্ক। আর সেই প্রতিটা ঝড়ের ছবিতে রামধনুর মতো উজ্জ্বল হয়ে থেকেছে এক একটি সরস্বতী পুজো।

একই কথা বললেন জেন ওয়াইয়ের প্রিয়াঙ্কাও। আর ক’দিন পরেই সায়নের সঙ্গে বিয়ে তাঁর। দু’বাড়ির সবাই সব জানলেও এই দিনটায় দু’জনে মিলে একটু আড়াল হওয়ার মজাই আলাদা। সেই স্কুলের কথা মনে পড়ে যায়।’’— কালো শাড়ি সামলে, লাজুক হেসে বললেন প্রিয়াঙ্কা। সায়ন বললেন, ‘‘নতুন প্রেমে এই প্রথম সরস্বতী পুজো। না বেরোলে হয়?’’

সত্যিই, সরস্বতী পুজোর দিন পাটভাঙা শাড়ি আর আনকোরা পাঞ্জাবির যুগ্ম-খসখসেই যেন গাঢ় হয় বাঙালির প্রেম। নবীন-প্রবীণ সব প্রজন্মই আজ এক কথায় মেনে নিল, প্রেম সারা বছরের। কিন্তু অলিখিত ভাবে চুক্তি করে পরা নতুন শাড়ি আর পাঞ্জাবিতেই যেন প্রেমে আলাদা মাত্রা পেয়ে যায় এই বিশেষ দিনটি। আর সেই মাত্রা কোনও দিনই ছুঁতে পারে না প্রেম-দিবস হিসেবে ঘোষিত ভ্যালেন্টাইন্স ডে।

সন্ধের মুখে মিলেনিয়াম পার্কে আকাশি শাড়ির আঁচল উড়িয়ে রীতিমতো হনহন কর ছুটছে বছর ছাব্বিশের তিতাস। দেরি হয়ে গিয়েছে, বাড়ি ফিরতে হবে। সাফ বললেন, আমাদের এত মিষ্টি একটা পুজো থাকতে, এমন সুন্দর করে বসন্তের সূচনা থাকতে আর কোনও বিদেশি ‘ডে’ লাগে নাকি বাঙালির প্রেম করতে? পাশে পাশে হাঁটা, বছর দশেক তিতাসের সঙ্গে প্রেম করা কৌশিকও একমত। জোর করে বিশেষ দিন চাপিয়ে দিলেই ভালবাসা বাড়ে না। সরস্বতী পুজোয় যে মিষ্টত্ব আছে, তাতে এমনিই প্রেম আসে।
সূত্র: আনন্দবাজার

LEAVE A REPLY