চলতি বছর বাংলাদেশের বাজারের জন্য টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার মোবাইল হ্যান্ডসেট। আর হ্যান্ডসেট মডেলের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। ৪৫টি হ্যান্ডসেট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তাদের দাবি, বছর শেষ হওয়ার আগেই হয়তো এবার টার্গেট পূরণ করা সম্ভব হবে। কারণ, বাংলাদেশে মোবাইল হ্যান্ডসেটের বাজার এখন উঠতি অবস্থায় আছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হ্যান্ডসেটের চাহিদা অনেক বেশি। পাশাপাশি খুব কম সময়ের মধ্যে বেশি দামের হ্যান্ডসেট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তাই কম দামের ও কম প্রযুক্তির হ্যান্ডসেটের বাজার দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাড়ছে স্মার্টফোনের চাহিদা। কমছে ফিচার ফোনের ব্যবহার। বাংলাদেশ মোবাইলফোন আমদানিকারক এসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে বাংলাদেশের মোবাইল গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের হ্যান্ডসেট আমদানি করা হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকার। হ্যান্ডসেটের সংখ্যা ৩ কোটি ১০ লাখের বেশি (৩১.২ মিলিয়ন)। প্রায় ৫৫টি হ্যান্ডসেট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এ সময়ের মধ্যে ১৫শ’ মডেলের মোবাইলফোন বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এ খাত থেকে সরকারের আয় হয়েছে ১৩শ’ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ব্যবসায়িক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গত বছর ছিলো স্মার্টফোনের রমরমা অবস্থা। কারণ ওই বছরে মোট হ্যান্ডসেট আমদানির ২৬ ভাগই স্মার্টফোন। এদিকে ২০১৬ সালের সবচেয়ে বেশি হ্যান্ডসেট ১১ দশমিক ২ মিলিয়ন আমদানি করেছে সিম্ফনি। এরপরই রয়েছে স্যামস্যাং। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবার আরো ২ হাজার কোটি টাকার টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। বিপুল অঙ্কের হ্যান্ডসেট বাজার নিয়ে আমদানিকারকদের মধ্যে রয়েছে নানা হতাশা, অভিযোগ। তাদের দাবি, নীতিনির্ধারকদের ‘ব্যবসাবান্ধব’ নয় এমন বেশকিছু সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার। প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে বৈধ ব্যবসায়। এ জন্য তিনটি কারণকে দায়ী করছেন হ্যান্ডসেট আমদানিকারকরা। এগুলো হচ্ছে-সরকারের ট্যাক্স কাঠামো, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির দুর্বলতা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের অর্থের বিনিময়ে সুযোগ করে দেয়া। এ প্রসঙ্গে উইনটেল লিমিটেডের চেয়ারম্যান এটিএম মাহবুবুল আলম মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসার প্রধান বাধা ট্যাক্স কাঠামো। এনবিআর ও পলিসি নির্ধারকরা বাংলাদেশে হ্যান্ডসেট প্রবেশ মুখে ট্যাক্স আদায় করছেন ২৫ ভাগের বেশি। তাদের এ নীতির কারণে আন্ডার ইনভয়েসিং ও চোরাইপথে হ্যান্ডসেট আমদানি বেড়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মোবাইল মাধ্যমে ব্যয় হয় ২৪ হাজার কোটি টাকা। যদি হ্যান্ডসেট প্রবেশ মুখে ওই ট্যাক্স আদায় না করে ইউজের ওপর থেকে আদায় করার ব্যবস্থা নেয় তাহলে সরকারের আয় আরো বেশি হবে। অন্যদিকে চোরাইপথে মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিও কমবে। এ ইস্যুতে বিটিআরসির দুর্বলতাকে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা বলে মন্তব্য করেন এশিয়ান ট্রেডিং কোম্পানির (স্মার্ট মোবাইল) এমডি লুৎফর রহমান সুজন। তিনি বলেন, বেশিরভাগ আমদানি করতে ইচ্ছুক ব্যবসায়ীরা বিটিআরসির কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় বৈধপথে হ্যান্ডসেট আমদানি করতে পারে না। বিশেষ করে আমদানিকারকদের কাছ থেকে বিটিআরসি যে ট্রিপল সি সার্টিফিকেট চায় তা দেয়া সম্ভব হয় না। বড় কোম্পানিগুলো হয়তো ওই সার্টিফিকেট দিতে পারে কিন্তু ছোট কোম্পানিগুলো দিতে পারে না। এছাড়া হ্যান্ডসেটের ওপর বিটিআরসির মনিটরিং ব্যবস্থা অনেক দুর্বল। এ কারণে হ্যান্ডসেট সেক্টরটা কিছুটা অস্থির। অন্যদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে হ্যান্ডসেট ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা বলে জানান শাওমির ডিস্ট্রিবিউটর ও সোলার ইলেকট্রো বাংলাদেশ লিমিটেডের এমডি ডিএম মজিবর রহমান। মানবজমিনকে তিনি বলেন, প্রতি মাসে বৈধ পথে শাওমির হ্যান্ডসেট আমদানি করি ৩ থেকে ৪ হাজার। অন্যদিকে যারা অবৈধ পথে ব্যবসা করেন তারা মাসে সেট আনেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার। এই অবস্থার মধ্যই আমাদের ব্যবসা করতে হচ্ছে। সরকার আমাদের কাছ থেকে হিসাব করে ট্যাক্স বুঝে নেন। আর অবৈধ ব্যবসায়ীরা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তিনি বলেন, বিমানবন্দরকে ম্যানেজ করে অবৈধ পথে হাজার হাজার হ্যান্ডসেট আনা হচ্ছে। কথিত আছে প্রতি মাসে বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা ঘুষ দেয়া হয়। উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, বসুন্ধরায় শাওমির দুটি শোরুম আছে। অথচ একই মার্কেটের অন্তত ৫০টি দোকানে শাওমির হ্যান্ডসেট পাওয়া যায়। এগুলো কোথা থেকে আসে, কারা এসব সরবরাহ করেন? বিএমপিআইএর প্রেসিডেন্ট রুহুল আলম আল মাহবুব (মানিক) ও সাধারণ সম্পাদক রিজওয়ানুল হক মানবজমিনকে বলেন, চলতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকার হ্যান্ডসেট আমদানির যে টার্গেট নেয়া হয়েছে তা হয়তো বছর শেষ হওয়ার আগেই পূরণ করা সম্ভব হবে। এ সেক্টরটার জন্য প্রয়োজন সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। বিশেষ করে হ্যান্ডসেট ব্যবসার প্রতিবন্ধকতাগুলো খুঁজে বের করে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার এখনই সময়। এতে সরকার, গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা একইসঙ্গে লাভবান হতে পারে। তারা জানান, স্মার্টফোনের বাজার বৃদ্ধির একটি প্রধান নিয়ামক হলো মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক বৃদ্ধি। গত ৪ বছরে মোবাইলফোন ও মোবাইল ইন্টারনেট বৃদ্ধি পাওয়ায় স্মার্টফোনের চাহিদা বেড়েছে। এক পরিসংখ্যানে তারা জানান, ২০১৬ সালে মোট মোবাইলফোন গ্রাহক ১২০ মিলিয়ন। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক ৬৩ মিলিয়ন। একটি বাজার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ৫ ইঞ্চি ডিসপ্লে মাপের স্মার্টফোনের। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভোক্তাদের মধ্যেও যুগোপযোগী প্রযুক্তি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কম দামের হ্যান্ডসেট কেনার থেকে বেশি দামের হ্যান্ডসেট কেনার প্রতি এদেশের ভোক্তাদের বিশেষ চাহিদা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

LEAVE A REPLY