জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সম্মিলিত, কার্যকর ও সঙ্গতিপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে জোর তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি একই সঙ্গে পানির জন্য একটি বৈশ্বিক তহবিল গঠনে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
গত শনিবার স্থানীয় সময় বিকেলে জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ‘ক্লাইমেট সিকিউরিটি : গুড কপ, ব্যাড কপস’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় বক্তৃতা করছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ডয়েচে ভেলের চিফ পলিটিক্যাল করেসপন্ডেন্ট মেলিন্ডা ক্রেইনের সঞ্চালনায় আলোচনায় ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট সাউলি নিনিস্তো, সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগোট ওয়ালস্টোম, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর সেলডন হোয়াইটহাউস অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সামনে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক ইস্যু এবং এর সমাধান অবশ্যই বৈশ্বিকভাবে হতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত এবং কার্যকর পদক্ষেপ। কোনো একটি দেশের অসহযোগিতা সবার জন্য হুমকি হতে পারে। সেজন্য আমরা অবশ্যই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেবো।
জলবায়ু পরিবর্তন নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্পদের ওপর চাপ বাড়ে। এতে অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা ও সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে- যা মূলত জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করে তুলতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রধান উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করে শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন এবং মান উভয়ই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেজন্য জলবায়ু পরিবর্তন সহিষ্ণু চাষাবাদ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা প্রয়োজন।
পানি নিরাপত্তাকে দ্বিতীয় উপাদান হিসেবে তুলে ধরে পানির জন্য তহবিল গঠনে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য কারণে জীবন ও জীবিকার জন্য বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির সঙ্কট তীব্র হয়ে উঠছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসনকে তৃতীয় উপাদান হিসেবে তুলে ধরে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লাখ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছে। এটি সরাসরি সামাজিকভাবে সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, এর ফলে নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে।
শেখ হাসিনা জানান, বাংলাদেশ উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্বন নিঃসরণ নিম্নমাত্রায় নিয়ে আসার লক্ষ্য অর্জনে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৯ সালে ৪শ’ মিলিয়ন ডলারের ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন’ করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশ্বনেতাদের বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের এ সাফল্যে অনেক দেশ তা অনুসরণ করছে।
এ সময় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় প্রায় ৯শ’ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে কোস্টাল গ্রিন বেল্ট প্রকল্প, দেশব্যাপী প্রায় ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনসহ প্রভৃতি কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫৩তম মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগদান শেষে গতকাল রোববার রাতে দেশে পৌঁছেছেন। জামার্নিতে তিন দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফেরার পথে তিনি ইতিহাদ এয়ারওয়েজ ফ্লাইটে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ১০ মিনিটে আবুধাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। বিমানবন্দরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে প্রায় ছয় ঘণ্টা যাত্রাবিরতির পর দেশের পথে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাত ৮টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সফরসঙ্গীরা ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন।
জার্মানিতে সফর শেষে গত শনিবার স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ৩টা) মিউনিখ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আবুধাবির উদ্দেশ্যে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ইমতিয়াজ আহমেদ।
বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা আলোচনার সেরা ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কনফারেন্স’ হিসেবে বিবেচিত মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে যোগ দিতে গত শুক্রবার ভোরে মিউনিখে পৌঁছান শেখ হাসিনা। ওই দিন বিকালে সিকিউরিটি কনফারেন্সের ৫৩তম আসরের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ সাড়ে চারশ’ প্রতিনিধি এই সম্মেলনে অংশ নেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী, পোল্যান্ড ও আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস এবং রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, সউদী আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। এবারই প্রথম বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা এই সম্মেলনে যোগ দিলেন। প্রধানমন্ত্রী শনিবার জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এদিন সিকিউরিটি কনফারেন্সের একটি প্যানেল আলোচনায়ও অংশ নেন তিনি। সফরের প্রথম দিন জার্মান আওয়ামী লীগ আয়োজিত ইউরোপ প্রবাসীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন শেখ হাসিনা। এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, স্বরাষ্ট্র সচিব কামালউদ্দিন আহমেদ ও প্রেস সচিব ইহসানুল করিম।

LEAVE A REPLY