অধুনা খবরের কাগজে প্রায়ই দেখা যায়, অমুক যৌতুকের বলি। দেখা যায়, পাষণ্ড স্বামী স্ত্রীর গায়ে হাত তুলছে যৌতুকের জন্য। স্বামীর যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে স্ত্রীর আত্মহত্যা। যৌতুককে কেন্দ্র করে সংসার ভাঙার খবর তো নিয়মিতই আছে আমাদের আশপাশে। অথচ একটা মুসলিম সমাজের খবরগুলো এমন হওয়ার কথা ছিল না। যৌতুক নামের পরিভাষাটিরই অস্তিত্ব থাকার কথা নয় কোনো মুসলমানের অভিধানে। যৌতুক নামের এ বিষাক্ত প্রথাটি এসেছে উপমহাদেশীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জীবনব্যবস্থা থেকে। তাদের ধর্মমতে, মেয়ে সন্তান পিতার সম্পদের উত্তরাধিকারী হয় না। তাই বিয়ের সময় মেয়ে যত বেশি নিতে পারে ততই তার লাভ। কিন্তু মুসলিম সমাজের বিধান তো স্পষ্ট। পিতার সম্পদের উত্তরাধিকারী হয় কন্যা। তবে কেন যৌতুক নামের অশান্তির এ নীলবিষের অস্তিত্ব আমাদের সমাজে?

একজন পিতা একটি মেয়েকে জন্মের পর ১৮ থেকে ৩০ বছর পর্যন্তু হৃদয়ের সব অনুরাগ আর জীবনের অর্জিত সম্পদ খরচ করে প্রতিপালন করেন। কন্যার সব স্বাদ-আহাদ পূরণ করেন। এরপর সেই পিতা তার আদরের মেয়েকে, মা তার নাড়িছেঁড়া ধনকে তুলে দেন একজন পুরুষের হাতে। মাঝের সময়টিতে তার শিা ও চিকিৎসাসহ সব ধরনের ব্যয় নির্বাহ করেন বাবা-মা। একজন মেয়ে সন্তানকে লালনপালন করে কী এমন অপরাধ করেন সেই বাবা-মা? যে নিজের আদরের মেয়েটিকে তো দিয়েই দেন সব স্বত্ব ত্যাগ করে। সেই সাথে দিয়ে দিতে হয় মোটা অঙ্কের উৎকোচ! কেন আমরা এতটা অমানবিক? কেন আমরা এতটা স্বার্থপর? লোভ কেন আমাদের মানবিক বোধের বাইরে নিয়ে যায়?

ইসলামের শিা হলো বিয়ের সময় বর কনেকে মোহর দিয়ে দেবে। মোহর দ্রুত আদায় করবে। কোনোভাবেই মোহর মারযোগ্য নয়। মোহর আদায় করা ফরজ। অথচ সেই মোহর আদায়ে আমাদের কালপেণ আর গড়িমসি দুঃখজনকপর্যায়ের। অপর দিকে যেখানে যৌতুক সুস্পষ্ট হারাম সেটা পাওয়ার জন্য নানা বাহানা আর নানা যুক্তির অবতারণা করি। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের মোহরানা মনের সন্তোষসহকারেই আদায় করো’ (সূরা নিসা : ৪)।

যৌতুক সবসময় একটি ঘৃণ্য অপরাধ। বাংলাদেশের আইনেও এটা অপরাধ। শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যে নেয় এবং যে দেয় সবাই জানে এটা অন্যায়; কিন্তু সামাজিকতা ও মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে অনেক পরিবারই বরপরে অন্যায় আবদার মেনে নেয়। ইসলামের দৃষ্টিতেও এটা হারাম। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও এটা অবৈধ। এমন অবৈধ সম্পদের মধ্যে কোনোরকম সুখ থাকতে পারে না। কোনো মর্যাদাও থাকতে পারে না যৌতুকলোভীর। না সামাজিক মর্যাদা, না ধর্মীয় মর্যাদা। যদিও অনেক সময় সামাজিক প্রতিপত্তির কারণে অনেকেই যৌতুকগ্রহীতার প্রতি প্রকাশ্য ঘৃণাটা প্রকাশ করতে পারে না। হজরত ওমর রা: বলেন, ‘হে মুসলমান সম্প্রদায়! তোমরা বিয়েতে মোটা অঙ্কের মোহর, আড়ম্বরতা এবং যৌতুক দাবি করো না, কেননা আল্লাহর কাছে এটার কোনো মর্যাদা বা মূল্য নেই। যদি থাকত তাহলে রাসূল সা: তাঁর মেয়ে ফাতেমার রা: বিয়েতে করতেন’ (তিরমিজি)।

একটি পরিবার মেয়েকে পাত্রস্থ করতে এক সময় বাধ্য হয়ে যৌতুক দেয়। যদিও স্বীয় মেয়েটিকে লালনপালন করার সময় একবারও ভাবেনি যৌতুক দিয়ে তাকে পাত্রস্থ করবেন। কোনো বাবা-মাই সন্তুষ্টচিত্তে যৌতুক দেন না। তবে কেউ কেউ নিজ সন্তানের সুখের চিন্তা করে স্বপ্রণোদিত হয়েই কিছু উপহার দেন। সে বিষয়ে কোনো সমস্যা ইসলামে নেই; কিন্তু যে কোনোভাবেই যদি বাধ্য করা হয় তখন তা আর হালাল থাকে না। সে জন্য বিয়েতে যৌতুক দাবি করে আদায় করা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। নিঃসন্দেহে বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। কখনোই এটি ব্যবসায়িক মাধ্যম বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হতে পারে না। এটি একটি ইবাদত। আর কোনো ইবাদত কারো অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হলে সেটা হবে স্পষ্ট বিদাত।

বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারি মহানবী সা:-এর আদর্শের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান যৌতুকের মতো জঘন্য রীতি রোধ করা সম্ভব। একমাত্র তার প্রবর্তিত সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আমাদের দেশের নারীসমাজের ইজ্জত-আবরুর যথাযথ সংরণ এবং সমাজে নারীদের নিরাপদ ও সম্মানজনক অবস্থান সুনিশ্চিত হতে পারে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শত শত নারী সংগঠন সৃষ্টি হয়েছে। নারী মুক্তির জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে অথচ দিন দিন নারী তার মর্যাদা হারাচ্ছে। এর একমাত্র কারণ নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা:-এর আদেশ-নিষেধ মেনে না চলা।

বিয়ে উপলে মেয়েপরে ওপর চাপিয়ে দেয়া যৌতুকের এ অভিশাপ কেবল আমাদের দেশে সীমাবদ্ধ নয়। এর বিস্তৃতি পুরো উপমহাদেশজুড়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান। ১৯৪৭-পূর্ব ভারতবর্ষের বর্তমান সীমানায় যৌতুক প্রথার প্রচলন রমরমা ছিল। ঠিক এভাবে ও এরূপে যৌতুক প্রচলনের নজির পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে পাওয়া যায় না।

আমাদের সমাজে যৌতুক গ্রহণের কারণটি হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি ভয়হীনতা এবং শরিয়তের বিধানের প্রতি অবজ্ঞা ও উদাসীনতা। নারীর মর্যাদা দান ও নারীর আর্থিক অধিকার সুরায় ইসলাম যে বিধিবিধান দিয়েছে তার প্রতি সাধারণপর্যায়ের সম্মানবোধ থাকলে কোনো বরের পরিবারের পইে যৌতুক গ্রহণের কোনো উদ্যোগ থাকার কথা ছিল না।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিয়ে হচ্ছে সবচেয়ে পুরনো প্রতিষ্ঠান ও সভ্য সমাজের ভিত্তি। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মুহাম্মদ সা:-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ মানুষের জন্য বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন প্রণয়ন ও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। বিয়েশাদি নর-নারীর মাঝে পবিত্র বন্ধনব্যবস্থা। যে ব্যবস্থার ফলে সুস্থ, সংহত এবং শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করার নিশ্চয়তা লাভ করে সমাজ। ইসলামি দিকদর্শন ও নীতিমালায় যৌতুক লেনদেন শরিয়তের ঘোর বিরোধী। বরপণ দেয়ার কোনো অস্তিত্ব নেই পবিত্র কুরআন ও হাদিসে।

যৌতুক বাংলা শব্দ, প্রতিশব্দ পণ। দুটোই সংস্কৃত থেকে এসেছে। হিন্দিতে দহিজ, ইংরেজিতে Dowry, আরবিতে বায়িনাতুন, দুত্বাতুন মাহরুন প্রভৃতি। ‘যৌতুক হলো বিয়ে উপলে মেয়ে বা মেয়ের পরিবারের প থেকে বরকে প্রদেয় সম্পদ’। (এনসাইকোপেডিয়া ব্রিটানিকা)। আর বাংলা পিডিয়ায় বলা হয়েছে, ‘বিয়ের চুক্তি অনুসারে মেয়েপ বরপকে বা বরপ মেয়েপকে যে সম্পত্তি বা অর্থ দেয় তাকে যৌতুক বা পণ বলে।’ যৌতুকের মতো অশুভ জঘন্যতম প্রথাটি বাঙালি সমাজের অতি পুরনো সংস্কার। এক সময় বাঙালি মুসলিমসমাজে বিশ শতকের আগে বরপরে দাবি ও বধূ নির্যাতনের ঘাতকরূপে যৌতুক অথবা বরপণের অস্তিত্ব ছিল না। মূলত হিন্দুদের সংস্কৃতি থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজে এ সংস্কৃতি অনুপ্রবেশ করেছে। পৃথিবীর আর কোনো মুসলিম সমাজে এ ধরনের যৌতুক প্রথার প্রচলন নেই।

মূলত বিয়ে হলো দ্বিপীয় চুক্তি। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অন্যের কাছে উপকৃত ও পরিতৃপ্ত হওয়ার মাধ্যম। কিন্তু স্বামীর অধিকার বেশি। তাই স্ত্রীর কর্তব্য অধিক। মহানবী সা:-এর জমানার রেওয়াজ অনুযায়ী সদ্য বিয়ে শেষে বরপ তার নতুন আত্মীয়দের অলিমা (বৌভাত) খাওয়াবে। বিয়ের েেত্র এ দু’টিই খরচ প্রণিধানযোগ্য আর তা ছেলের প থেকে হতে হবে। আর স্ত্রীর ভরণপোষণ তো আছেই। তবে শ্বশুরবাড়ির প থেকে বাবার সামর্থ্যানুযায়ী মেয়ের সংসারের জন্য বা জামাইয়ের জন্য যৎসামান্য উপহার প্রদান করাতে দোষ নেই। তবে কোনোভাবেই তা বিয়ের প্রত্য বা পরো শর্ত হিসেবে দেয়া যাবে না। প্রিয় নবী সা: ও তাঁর মেয়ে হজরত ফাতেমা রা:-এর বিয়েতে মেয়ের সংসারের জন্য একটি যাঁতা উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। অন্য বর্ণনায় আছে, যৌতুক হিসেবে তিনি হজরত ফাতেমাকে একটি পশমে নির্মিত সাদা রঙের চাদর, একটি ইজখির ঘাসনির্মিত বালিশ এবং চর্মনির্মিত পানির মশক দিয়েছিলেন। (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)।

বর্তমানে প্রচলিত যৌতুক নামে জঘন্য অপকর্মটি নিঃসন্দেহে আল্লাহর গজব বিশেষ। মূলত সামাজিক অবয়ের কারণে এটা বিস্তৃত। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮০ সালে যৌতুকবিরোধী আইন পাস করেছে, যা দণ্ডবিধির আওতাভুক্ত অপরাধ বটে। নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ অভিশপ্ত যৌতুক। যৌতুকের অর্থসম্পদ দাবি করা ইসলামের দৃষ্টিতে পরিষ্কার অবৈধ বা হারাম। নির্ঘাত ইসলামী বিধানের বিরুদ্ধাচরণ।

LEAVE A REPLY