সাংসদ মনজুরুল ইসলামকে (লিটন) হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাবেক সাংসদ আবদুল কাদের খানের নাম আসায় বিস্মিত সবাই। সাংসদ মনজুরুলের পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠজন ও দলের নেতা কেউই ভাবতে পারেননি যে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল কাদের খান এমন কিছু ঘটাতে পারেন।

এদিকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় কাদের খানের গ্রামের বাড়ির উঠান খুঁড়ে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। গত বুধবার ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয় আনারুল ইসলাম ওরফে রানা (২৭) নামের আরেক সন্দেহভাজনকে। তাঁর বাড়ি সুন্দরগঞ্জের ভেলারার কাজীরভিটা গ্রামে। রানা গতকাল বৃহস্পতিবার গাইবান্ধার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ নিয়ে সাংসদ মনজুরুল হত্যার ঘটনায় চারজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন কাদের খানের গাড়ির চালক।

গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, রিমান্ডে থাকা কাদের খানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বুধবার রাতে সুন্দরগঞ্জের ছাপারহাটিতে তাঁর গ্রামের বাড়ির উঠানের মাটি খুঁড়ে একটি পিস্তল, ছয়টি গুলিসহ একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্রটি সাংসদ হত্যায় ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এটা পরীক্ষা করে দেখা হবে।

গতকাল দুপুরে সুন্দরগঞ্জের ছাপারহাটিতে আবদুল কাদের খানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ি ঘিরে এলাকার মানুষের জটলা। পুলিশ কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। দোতলা বাড়িটির নিচতলার সামনের কক্ষে পুলিশের কয়েকজন সদস্য বসে আছেন। উঠানে বসে ছিলেন গাইবান্ধার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) রবিউল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন। বাড়ির একটি গাছের গোড়া থেকে মাটি খুঁড়ে একটি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করেছেন। বাড়িতে আবারও তল্লাশি চালানো হবে। বাড়িতে কাদের খানের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তান ছাড়া পরিবারের আর কেউ নেই।

এএসপি রবিউল বলেন, সাংসদ হত্যায় তিনটি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তাঁরা ধারণা করছেন। একটি অস্ত্র কাদের খান আগেই থানায় জমা দিয়েছেন। আরেকটি পাওয়া গেছে উঠানে গাছের গোড়ায়। অন্যটি কোথায় তা খোঁজা হচ্ছে।

গত ৩১ ডিসেম্বর সুন্দরগঞ্জে নিজ বাড়িতে সাংসদ মনজুরুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এরপর আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সন্দেহ ছিল জামায়াতে ইসলামীর দিকে। সন্দেহভাজন হিসেবে জামায়াত-শিবিরের ১১০ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। আবার কারও কারও সন্দেহ ছিল জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রতি। এমনকি সাংসদের পরিবারের কোনো কোনো সদস্যদের দিকেও আঙুল তুলেছিলেন কেউ কেউ।

ঘটনার ১ মাস ২০ দিনের মাথায় মামলার তদন্তে ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয়। হত্যার মূল পরিকল্পনকারী হিসেবে গত মঙ্গলবার বগুড়া শহরের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সাবেক সাংসদ ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কাদের খানকে। পরদিন বুধবার গাইবান্ধার আদালতে তাঁকে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। মনজুরুল ইসলাম যে আসনের সাংসদ ছিলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ওই আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন কাদের খান। তাঁকে গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত মনজুরুলের সঙ্গে তাঁর বৈরী সম্পর্ক ছিল এমন কথা কেউ বলেননি।

এ নিয়ে গতকাল কথা হয় সাংসদ মনজুরুলের স্ত্রী ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দা খুরশিদ জাহানের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কখনো ভাবিনি। মাথায়ই আসেনি, কাদের সাহেব এমন ঘটনা ঘটাবেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। কখনো কোনো কথা-কাটাকাটিও হয়নি।’

গত সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরও মনজুরুল হত্যায় কাদের খানের প্রতি কি কোনো সন্দেহ হয়নি? এ প্রশ্নের জবাবে সৈয়দা খুরশিদ জাহান বলেন, ‘ওনাকে নিয়ে তো কখনো কোনো আলোচনা ছিল না। তাঁকে অমনভাবে চিনিও না। ২০০৮ সালে নমিনেশন পাওয়ার পর আমাদের বাসায় একবার এসেছিলেন, তখন দেখেছি। আর ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদে একবার উনি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কেউ একজন আমাকে বলেছিল, উনিই কাদের সাহেব।’

মনজুরুলের একসময়ের একান্ত সহকারী ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (সুজা)। তিনি সুন্দরগঞ্জের ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। গতকাল ধোপাডাঙ্গার নতুন বাজারে তাঁর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, ‘কোনো দিন কল্পনা করতে পারিনি, এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভাই (মনজুরুল) কাদের সাহেবকে হেল্প করেছিলেন। তাঁর মিটিং-মিছিল করে দিয়েছিলেন। এর জন্য নেতা-কর্মীদের টাকাপয়সাও দিয়েছেন। আমি নিজেও কাজ করেছিলাম।’

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কাদের খান আর মনজুরুল ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী। তখনো তাঁদের মধ্যে কোনো ঝামেলা হয়নি। জামায়াত-শিবির ৩৫-৪০টি কেন্দ্রে ভাঙচুর করায় নির্বাচনের ফলাফল পিছিয়েছিল। তিনি বলেন, জেলা পরিষদের ১ কোটি টাকার একটা বরাদ্দ নিয়ে মনজুরুলের সঙ্গে কাদের খানের বিরোধ তৈরি হয়েছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর। নির্বাচনের আগে ওই ১ কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। কাদের খানের দাবি, এই টাকা তিনি সাংসদ থাকাকালে বরাদ্দ এনেছেন, তিনিই এর দাবিদার। তিনি ১৭ লাখ টাকা উত্তোলনও করেন, কিন্তু কোনো কাজ করেননি। তখন এ নিয়ে জেলা পরিষদে আপত্তি দেন সাংসদ মনজুরুল। এরপর প্রকল্পের বাকি টাকা তোলার জন্য আবেদন করেন কাদের খান, কিন্তু আপত্তির কারণে তুলতে পারেননি। তখন এ নিয়ে একটি প্রকল্পের সভাপতিকে দিয়ে আদালতে মামলা করান কাদের। ওই সভাপতি হলেন কাদেরের আত্মীয়। শেষ পর্যন্ত বাকি টাকা আর কেউ তুলতে পারেননি। এর বাইরে আর কোনো বিরোধের কথা জানেন না জাহাঙ্গীর।

মহাজোটের শরিক হওয়া সত্ত্বেও কাদের খানের এমন কর্মকাণ্ডকে ‘চিন্তার অতীত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ শামস-উল-আলম। তিনি বলেন, ‘যদিও এরশাদ সাহেব দাবি করেছেন কাদের খান জাতীয় পার্টি করেন না, বা সম্পর্ক নেই; কিন্তু আমরা জানি কাদের খান গতবার এরশাদ সাহেবের নমিনি ছিলেন এবং তার আগেরবার এমপি হয়েছেন জাতীয় পার্টি থেকে।’ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

তবে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও আইনজীবী মিজানুর রহমান  বলেন, ‌‌‌‌‘আমাদের ধারণা, কাদের খান রাজনৈতিক বলি। কাদের খানকে রাজনৈতিকভাবে বলি দিয়েছেন এরশাদ। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। নেপথ্যে যারা আছে, তারা এখনো ধরা পড়েনি।’

পুলিশ বলছে, কাদের খান এক বছর ধরে সাংসদ মনজুরুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। হত‌্যায় অংশ নেওয়া চারজনকে একটি গুদামে ছয় মাস ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ‘আগামী নির্বাচনে নিজের পথ পরিষ্কার করতেই’ সাবেক সাংসদ কাদের খান এই হত্যাকাণ্ড ঘটান বলে পুলিশের দাবি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনজুরুল হত্যার মামলার বাদী ও তাঁর বড় বোন ফাহমিদা বুলবুল গতকাল বলেন, কাদের খানই একমাত্র পরিকল্পনাকারী, নাকি আরও পরিকল্পনাকারী আছে, তদন্তে তা ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

LEAVE A REPLY