কাজের ধরন একটু পাল্টালে ‘‌পেশাগত স্বাস্থ্যহানি’‌ থেকে রেহাই পাবেন দিন মজুর, কৃষক, মুটে, তঁাত শিল্পীরা। বাড়বে উৎপাদনও।  অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীরা কাজের ধরন নিয়ে একটু সচেতন হলেই স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে, বাড়বে কর্মফল দাবি করছেন ফিজিওলজিস্টরা। বিভিন্ন অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের নিয়ে সমীক্ষা করেছেন তঁারা। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে সুফল মিলেছে বলে দাবি করছেন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ, প্রেসিডেন্সি, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজির অধ্যাপকরা। দেশের ৮৫ শতাংশের বেশি কর্মী অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। অমানুষিক পরিশ্রম করার ফলে তঁারা অনেকেই অপুষ্টিতে ভোগে, স্বাস্থ্যহানি হয়। তঁারা সংগঠিত ক্ষেত্রের আওতায় নয়, তঁারা অবহেলিত। কৃষকের একাংশ, ইটভাটার শ্রমিক, মুটে, গয়নার কারিগর, সেলাইয়ের কারিগররাও এর মধ্যে পড়ে। এদেশের শ্রম শক্তির প্রায় নব্বইভাগ তঁাদের ওপরই নির্ভরশীল। আমেরিকা–সহ অন্যান্য বিদেশি সংস্থাও এঁদের কাজ নিয়ে সমীক্ষা করতে এদেশে এসেছেন।
মুটেওয়ালা–‌এক কুইন্টাল ওজনের বস্তা বইতেন। মাঝবয়স হতেই বিপত্তি। ঘাড়ে, পিঠে অসহ্য ব্যথা। শেষেমষ শয্যাশায়ী। প্যারালাইসিস। আলু চাষি। নাবালক অবস্থায় বাবার সঙ্গে জমিতে চাষ করা শুরু। বয়স বাড়তেই পিঠের পেশিতে যন্ত্রণা। ক্রমশ তা বেড়ে চিরস্থায়ী রোগের জায়গা করে নিল। দীর্ঘ দিন গয়নার কারিগর, পেশির যন্ত্রণায় কাবু। সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করেন। চোখে ব্যথা। মাথা যন্ত্রণা। এটাই যেন ওঁদের ভবিতব্য। নির্লিপ্তভাবে ওঁরা শুধুই কাজ করেন। ওঁরা অসংগঠিত। এ নিয়ে দেশে–বিদেশে গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। কোলে মার্কেটে শ্রমিকদের কাজ নিয়ে ভারত–আমেরিকা যৌথ উদ্যোগে কাজ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এমএসএমই দপ্তর এইভাবে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের  জন্য  ‘‌ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডিজাইনের’‌ সঙ্গে যৌথউদ্যোগে কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন সোমনাথবাবু, তিনি তিনি ‘‌আর্গনমিক্স’‌–এর ওপর কাজ করেন। তঁার কথায়, অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীরা কতটা কাজ করলেন সেটাই ভাবেন। ‘‌অকুপেশনাল হেলথ’‌ অর্থাৎ কাজ করতে গিয়ে তঁাদের কতটা শারীরিক ক্ষতি হয় তা দেখেন না। তিনি জানান, ‘‌এমব্রয়ডারি’‌–র কাজ করেন হাওড়ায় এরকম ৩৫০ জন মহিলার ওপর তিন বছর ধরে সমীক্ষা করেছি। দেখা গেছে, কাজ করতে গিয়ে, তাদের চোখ শুকনো লাগছিল। ঘাড় যন্ত্রণা, কোমরে ব্যথা হচ্ছিল। পরবর্তীতে ক্ষতি না হাওয়ার জন্য কিছু ‘‌ইন্টারভেনশন’‌, কিছু জিনিসপত্র তৈরি করা হয়েছে। কাজে ব্যবহৃত জিনিসের ডিজাইন সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে। কাজের সুবিধার্থে একটা ‘‌বক্স’‌ তৈরি করে দেওয়া হয়। তাতে তাদের সময় অনেকটা কম দরকার হয়েছে। শরীর ভালো আছে। দেখা গেছে,  এর ফলে তিরিশ শতাংশ উৎপাদনও বেড়েছে।
শিয়লদার কোলে মার্কেটে দেখা গেছে, প্রায় সবাই মাথায় লোড বয়ে নিয়ে যায় ১০০ কেজির ওপরে। ট্রাক থেকে জিনিস তুলে মাথায় নিয়ে হেঁটে গিয়ে বস্তা নামায়। রাস্তা পিছল। তাতে অনেক সময় কাজ করতে গিয়েতঁাদের  হাড় সরে যায়, চিড় ধরে। চেষ্টা হয়েছিল, চাকা লাগানো ঠেলায় করে মাল নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করার। কিন্তু, কোলে মার্কেটের রাস্তা সঙ্কীর্ণ হওয়ায় তা বাস্তবায়িত করা যায়নি। বিকল্প হিসেবে ওদের জিনিস ওঠানো–নামানো নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সচেতনতা তৈরি হল। প্রায় চার বছরের কাছাকাছি প্রায় হাজার তিনেক শ্রমিকের ওপর সমীক্ষা হয়। তাতে সুফল মিলেছে। তিন বছর হুগলিতে আলু চাষীদের ওপর গবেষণা হয়। চাষের জন্য জমিতে মাটি ফালা করার সময় তলপেটে চাপ দিয়ে যন্ত্র দিয়ে ঠোলা হয়। বদলে আমরা পিঠের পেশিকে কাজে লাগিয়ে ‘‌এইড’‌ বলে একটা যন্ত্র দিয়ে কাজ করার পদ্ধতি জানালাম। তাতে দুটো হাতও ফঁাকা থাকে। ২০০ জনের ওপর গবেষণা হয়। সুফল মেলে।
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক শুভাশিস সাহু বলেন, কাজ করার লোকের সংখ্যা প্রচুর থাকায় এঁদের স্বাস্থ্যের ওপর নজর দেওয়া হয় না। যারা রাস্তা তৈরির কাজ করছে, গয়না শিল্পে কাজ করে, ইটভাটার শ্রমিক এঁদের নিয়ে কাজ করেছি। গয়নার কারিগরদের ক্ষেত্রে দেখেছি ফুফুসের ক্ষতি তো হয়, লোহিত রক্তকণিকা ভঙ্গুর হয়ে যায়। এখন মুর্শিদাবাদ, নদীয়ায় তঁাত শিল্পীদের নিয়ে কাজ চলছে। সেখানে তঁাত বোনার জন্য নতুন বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে কাজ করতে গিয়ে তাদের পেশির ব্যথা কমে গেছে। একই বক্তব্য প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক দেবাশিস সেনের।

LEAVE A REPLY