বয়স কি হবে ৯০ কিংবা ৯৫। জন্মটা সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। বাবা মৌ মোঃ মহিউদ্দিন শাহ ও মা আজিবুন্নেছার সংসারে জন্ম হয় আমার গল্পের এই আদর্শ শিক্ষকের। আজকের এই গল্পটা মৌলভী আদর্শ শিক্ষক সোলায়মান স্যারকে নিয়ে।
হিমালয়ের পাদদেশে উত্তরের এক শান্ত জনপদ সীমান্ত ঘেষা উপজেলার নাম ডিমলা। ডানে তিস্তা ও বামে বুড়ীতিস্তা নদী বিধৌত এই জনপদ। নীলফামারী জেলার অর্ন্তগত ডিমলা উপজেলায় অবিস্থত ডিমলা রানী বৃন্দারানী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়টি। তৎকালীণ সময়ে এ অঞ্চলের এক মাত্র বিদ্যাপীঠ বে-সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলো এটি। বে-সরকারী এই বিদ্যালয়টিতে শান্ত স্নিগ্ধ গৌরব বর্নের এক টগবগে যুবক সলেমান স্যার। সবার পরিচতি ছিলেন তিনি। সম্ভবত ১৯৫০ সালের দিকে তিনি বিদ্যালয়টিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন। সে সময়ে বৃটিশকে তাড়িয়ে সদ্য জন্ম নেওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্র। হিন্দু অধ্যুষিত জনপদের শিক্ষিত হিন্দুরা সে সময় পূর্ব বাংলা ছেড়ে পশ্চিম বাংলায় পাড়ি জমিয়েছে। যে বিদ্যালয়টি কিনা ১৯১৩ সালে মতান্তরে তারাও আগে ডিমলার জমিদার রাজা জানকী বল্লভ সেনের সহধর্মীনি রানী বৃন্দারানী ও মহিয়সী নারী “রানীবৃন্দারানী” বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশ ভাগের ফলে সে সময় বিদ্যালটিতে ছাত্র/ছাত্রীর সংখ্যা ছিলোখবুই কম। নাই বল্লেই চলে,এমনকি শিক্ষক/শিক্ষিকাও নেই। এমনি এক মহেন্দ্রক্ষণে সে সময়কার প্রধান শিক্ষক প্রয়াত মৌলভী আফসার আলী তার জন্মস্থান জলঢাকা থেকে ডেকে আনেন চির সবুজ বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বর্তমানে বয়সের ভারে নুয়েপড়া সে সময়ের টকবকে যুবক সলায়মান স্যারকে। আদর্শবান এই শিক্ষককে নিয়ে কথা তার নাতী ফারদিন মাশরাফি শাহ’র সাথে। তিনি বলেন, আমি আমার বাবা-মা ও আমার শয্যাশায়ী দাদুর কাছে শুনেছি-
জলঢাকা উপজেলার নেকবক্ত গ্রামে এক বরেণ্য মুসলিম পরিবারে দাদু জন্ম গ্রহন করেন সম্ভবত ১৯৩০ সালের মার্চ মাসে। তার বাবা প্রয়াত মহিউদ্দিন শাহ্ বিখ্যাত ইসলামিক চিন্তাবিদ ও বড় আলেম ছিলেন। মাত্র ২য় শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় দাদু তার বাবাকে হারান এবং ৫ম শ্রেণীতে মা-কে হারান। সংসারে বড় ভাই-বোনেরা যে যারমত স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে উঠেন। কিন্তু ছোট্ট শিশুটি (সলায়মান স্যার) নিজগৃহ ত্যাগ করে শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিস্তা মাদ্রাসা, কাউনিয়া, শান্তাহার-বগুড়া এলাকায় অতিকষ্টে লেখাপড়া করেন। এসময় থাকনে লজিং। পরের সন্তান পড়ালেকা শিখিয়ে নিজে হয়ে উঠেন জ্ঞানী। চালিয়ে যান নিজের লেখাপড়াও। এভাবেই অবশেষে ফাযিল পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে আবারও ফিরে আসেন বাবা-মায়ের ভিটে মাটিতে। কিন্তু এতদিনে এতিম (সলায়মান স্যার) যত জায়গা জমি ছিলো তা (বাস্তুভিটাসহ পৈত্রিক স্থাবর-অস্থাবর) সম্পত্তি যা ছিলো তা সব কিছুই  জ্ঞাতি-কুষ্ঠিরা কুক্ষিগত করে ফেলেন। এসব জায়গা জমি উদ্ধারের সব চেষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে আবারও ত্যাগ করেন নিজ গৃহ। একদিন ভাগ্যে চক্রে দেখা মিলে তৎকালীণ সময়ের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রয়াত আফসার আলীর সাথে। তিনি এতিমের জীবনের কাহীনি শুনে নিজের সাথেই নিয়ে চলে আসেন
জলঢাকা হতে অচেনা জায়গা ডিমলায়। সেই যে ডিমলায় আসা আর ফিরেননি তিনি।
ধীরে ধীরে ছাত্র শিক্ষক হারিয়ে যাওয়া বিদ্যালয়টিতে সলেমান স্যারকে ঠাঁই করে দেন প্রয়াত তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আফসার স্যার। আস্তে আস্তে নি:শ্বেস হওয়ার পথে বিদ্যালয়টিতে নিয়োগ পেয়ে তিনি একটি চাকুরি পেলেও থাকার কোন স্থান ছিলনা সলায়মান স্যারের। সে সময়ে এ অঞ্চলে তিনি একেবারেই নবীন হওয়ায় কাউকে চিনতেন তিনি। শেষমেশ কুলকিনারা না পেয়ে অবশেষে স্থানীয় একজন শিক্ষক প্রয়াত কহর মাষ্টারের জৈষ্ঠ্য কন্যার সাথে পরিনয় সুত্রে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর থেকেই ডিমলা উপজেলার বাবুরহাট গ্রামে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন তিনি। কিন্তু বিদ্যালয়ে চাকরী পেলেও কি হবে ? ফাযিল পাসকে সে সময়ে মেট্রিক পাসের সমমুল্যে মুল্যায়িত করায় তার বেতন মাত্র ২৫ টাকা। এদিকে সময়ের ব্যবধানে আর্দশ শিক্ষক সলায়মান স্যার ততদিনে ছয় সন্তানের জনক। একদিকে বিশাল এই সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে তিনি প্রায় সময়েই হিমশিমে পড়তেন। এরপরেও তিনি ধৈর্য্য হারা হয়ে পড়েননি।
অপরদিকে তার উচ্চ শিক্ষা লাভের অদম্য ইচ্ছা শক্তি তাকে তাড়না করে ফেরছে। তাই তিনি আবার এসএসসি, এইচএসসি এবং বি.এ পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে সাফল্যের সাথে কৃতকার্য হন। এরই মধ্যে ছয় সন্তানকে সংসারে অনেক সীমাবদ্ধতা ও অভাবের মধ্যেও শিক্ষিত করে সরকারি চাকুরীর ব্যবস্থাও করে দেন। তারা বর্তমানে যে যার মত কর্মরত। তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পাশাপাশি স্বীয় জমিতে কৃষিকাজ করতেন এবং একজন সফল কৃষকও ছিলেন।
কালের অতল গহবরে বহুযুগ পেরিয়ে গেছেন। তার অগণিত ছাত্র-ছাত্রী আজ দেশের সুনামধন্য ব্যক্তি। যাদেরকে তিনি সন্তানতুল্য রুপে আগলে রেখে লেখাপড়া শিক্ষিয়েছেন তারা কেউ আজ এই মহান লোকটির খবরও জানেন না। দৈবাত তার দুই/একজন ছাত্র তাকে দখতে আসেন। তিনি বর্তমানে প্রায় দু’বছর যাবত বার্ধক্য জনিত কারণে শয্যাশায়ি।প্রতিটি মুর্হুতে তিনি মৃর্ত্যুর প্রহর গুনছেন। এগিয়ে চলেছেন মৃত্যর্ুৃর খুব কাছাকাছি। পতিœ বিয়োগ ঘটেছে তার প্রায় ছয় বছর আগেই। একাকী এ মানুষটি এখন একটি আধাপাকা ঘরে বন্দি জীবন যাপন করছেন। অসার নিন্তেজ হয়ে সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকেন এবং তার অতীত জীবনকে মনে করার চেষ্টা করেন। হয়ত সে সময়ের শিক্ষকতা জীবনের অনেক ঘটনাই তার চোখে সামনে ঘুরে ফিরছে। এ কারনে তিনি প্রায়শই এখন চোখের জ্বল ফেলেন। পরে থাকেন একেবারেই নিচ্চুপ হয়ে।
১৯৭১ সালে তিনি প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও বঙ্গবন্ধুর অনুচর ছিলেন। তাই ১৯৭৫ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে তাকে অনেক মানুষিক ভাবে নিগৃহিত হতে হয়। এখনো স্থানীয় আলেমদের অনেকে তাকে পছন্দ করেন না। কেননা তিনি বঙ্গবন্ধুর অনুচর। বঙ্গবন্ধুর কথা বললে তিনি এখনো কেঁদে উঠেন। আলেমদের অনেকে বলেন”একজন মাওলানা কি ভাবে আওয়ামীলীগের ভক্ত হয়? এসব বিষয় নিয়ে এই আদর্শ শিক্ষকের সাথে কথা হলে তিনি মৃদু কন্ঠে বলেন, একজন বড় আলেম বলে আমি বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসি। কেননা বঙ্গবন্ধু ইসলামের উদারতা ও মহত্ব মানুষকে শিখিয়েছেন।

LEAVE A REPLY