আসছে হোলি রঙ মাখবো। মাখবো শরীর ভরে আবির। ভরিয়ে দেব সেই আবিরের রঙ আমার প্রিয়জনের চোখে মুখে। সেই আবির যদি পলাশ থেকে হয় তবে তো সোনার সোহাগা। পলাশ মাখতে কার না ভাল লাগে। পলাশের গন্ধ শরীরে মম করবে ভাবাই যায় না। কিন্তু বাস্তব বলছে সম্ভব। বাজারের ঝুটা আবিরের সঙ্গে এখন সংঘাত। বাঁশের কৌটোয় পলাশ আবির তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। প্যাকেজিং ও মনোরম। বাঁশের কৌটো। ভাবা যায়। ফাগুন ধরেছে বনে বনে। রঙের পলাশ দেখেছি এমন মানুষ বোধহয় কম আছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলপাহাড়ি–‌বাঁশপাহাড়ি পেরিয়ে পুরুলিয়ার পথ। রাঙা পলাশে মোড়া। তাই বা বলি কেন লাল মাটির সেখানেই চোখ গেছে সেখানেই দেখেছি আগুন লেগেছে বনে বনে। সে দৃশ্য না দেখলে ভাবা যায় না। কত অনাদরে আদিবাসী অধ্যুষিত বনে বনে পলাশের সুর। যে সুরের সঙ্গে মাদলের মাতাল করা শব্দ। দূরে কোথাও হাতির ডাক। হায় পশ্চিমাঞ্চল তুমি তো পলাশের রঙে রাঙা। তোমার অন্য রঙের দরকার কি।
বলরামপুর থেকেই শুরু পথ চলা পলাশ আবিরের। আদিবাসী উন্নয়ণ দপ্তর ও রাজ্য তপশিলি জাতি–‌উপজাতি বিত্ত নিগমের আর্থিক সহায়তায় এই প্রকল্পের শুরু। আবিরের কোনও রাসায়নিক নেই। ফলে প্রাণ খুলে মেতে উঠুন বসন্ত উৎসবে। প্রথমেই প্রকল্পের সলতে উস্কানোর কাজে হাত দিয়েছে স্বনির্ভর দলের মেয়েরা। আবির তৈরি করে বাজার জাত করা হবে বিশেষ ভাবে বানানো বাঁশের কৌটায়। মোটা বাঁশ কেটে ইতিমধ্যেই কৌটো বানানোর কাজ চালু হয়ে গেছে। পুরুলিয়া আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকায় এলাকার স্বনির্ভর দলগুলি বাঁচার তাগিদে এটাকেই হাতিয়ার করে নানা কাজ করছে। এগিয়ে আসছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ও প্রশাসন। বেশ কিছুদিন আগে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ঘড়িদুয়ারা শাখা স্বনির্ভর দলের মেয়েদের সাক্ষরতার কাজ শুরু করেছিলেন। মিঠাইয়ের বদলে বই কিনতে শিখিয়েছিলেন শাখা প্রবন্ধক। প্রবন্ধকের নাম যতদূর জানা গেছে টি চট্টোপাধ্যায়। ব্যাঙ্কটি ছিল ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। মাওবাদী অধ্যুষিত বান্দোয়ান ব্লকের নানা উন্নয়ণমূলক কাজ হয়েছিল ঘড়িদুয়ারা শাখা থেকেই। আজও পুরুলিয়ায় স্বনির্ভর দল কাজ করে চলেছে। হোলিতে বহু মানুষ আসেন পুরুলিয়ায় পলাশ পার্বন করতে। সেই পলাশকেই হোলির দূত করতে চাইছে পুরুলিয়া। পলাশের রঙ ছড়িয়ে পড়ুক দেশ থেকে দেশান্তরে। পলাশের আগুন ফাগুনকে স্বাগত জানাচ্ছে সমস্ত জেলা জুড়ে। কেমন করে আবির বানানো চলছে এখানে। পলাশ থেকে রঙ তৈরি করে এক সময় ব্যাপকভাবে হোলি খেলা হতো এখানে। হোলির দিন দুয়েক আগে হাঁড়ি ভর্তি হলে পলাশ ফুল ফেলে দেওয়া হতো। হোলির দিন দুয়েক আগে হাঁড়ির হল কচলে নিলে বেরিয়ে আসতো গোলাপী বা লাল রঙ। সেই রঙিন জল পিচকারিতে ভরে চলতো দেদার খেলা। কিন্তু বাজারে চট জলদি রাসায়নিক রঙ ও আবির সেই রঙকে হটিয়ে দেয়। কিন্তু যতদিন যাচ্ছে মানুষের মুখ সরিয়ে নিচ্ছে রাসায়নিক রঙ থেকে। কারণ রাসায়নিকের পাশ্ব প্রতিক্রিয়া। পলাশ থেকে আবির তৈরি ব্যাপকভাবে শুরু হলে মার্কেটিং–‌এর অভাব হবে না। শুধু পুরুলিয়া কেন সমস্ত রাঢ় বাংলাতেই প্রচুর পলাশ পাওয়া যায়। ফলে কাঁচা মালের অভাব নেই এখানে। বনে বনে রয়েছে পলাশ। পশ্চিম মেদিনীপুর ও বাঁকুড়াতেও পলাশ ফোটে বনে বনে। এবার হয়তো ব্যাপক আবির তৈরি হবে না। তবে পুরুলিয়ার বাজারে তা অমিল হবে না। আগামী বছর থেকেই গোটা বাংলাতেই পাওয়া যাবে বাঁশের কৌটোয় পলাশ আবির। ফুল থেকে রং নিষ্কাশন করে পাউডার মিলিয়ে আবির তৈরি করতে হয়তো একটু বেশি খরচ হবে। কিন্তু ফুল শুকিয়ে গুড়ো করে তৈরি আবিরের দাম খুব একটা বেশি হবে না বলেই স্থানীয়দের অভিমত। শুধু পলাশই বা কেন গাঁদা, নীলকণ্ঠ ফুল থেকেও একই ভাবে আবির তৈরি করা যাবে। সে ক্ষেত্রে অবশ্য পাল্টে যাবে আবিরের রঙ। রক্ষে কি যায় আসে। ফুলের পাপড়ি থেকে রাসায়নিকহীন আবির মাখতে সারা বিশ্ব উৎসাহী। হয়তো একদিন পলাশ আবির ঠাঁই নেবে বিশ্বের মানচিত্রে। উড়ো জাহাজে চেপে পলাশ চলবে দেশ থেকে দেশান্তরে। উদ্যোগটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। বিদেশী মুদ্রার ঝনঝনানি শুনতে পাচ্ছে ছৌ–‌এর পুরুলিয়া। মুখোশের জেলা পলাশ আবিরে যে সর্বাগ্রে থাকবে তাতে সন্দেহের কি আছে।

LEAVE A REPLY