শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবিরসহ ১২ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল আনসার আল ইসলামের ‘স্লিপার সেল’। মালয়েশিয়া থেকে রেজোয়ানুল আজাদ রানা ও জুন্নুন সিকদার এই পরিকল্পনা ঠিক করেছিল। ডার্ক ওয়েভের (ইন্টারনেটের গোপন ওয়েবসাইট) মাধ্যমে আনসার আল ইসলামের মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়াউল হকের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়। মেজর জিয়া স্লিপার সেলের সদস্যদের কাছে হত্যার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম-ঠিকানা ও ছবি পাঠিয়ে দেয় অপারেশন পরিচালনা করতে। ব্ল­গার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আনা রেদোয়ানুল আজাদ রানা দুই দফায় ৮ দিনের  রিমান্ডে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য জানিয়েছে। গতকাল শনিবার তার দ্বিতীয় দফার তিন দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। আজ মিরপুর মনিপুর স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষককে হত্যা পরিকল্পনার মামলা অথবা উত্তরার ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যা চেষ্টার মামলায় তার রিমান্ড চেয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হতে পারে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য দিয়ে একজন কর্মকর্তা বলেন, চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার নির্দেশনা আর আনসার আল ইসলামের তাত্ত্বিক নেতা জসিম উদ্দিন রাহমানীর বয়ানে উদ্বুদ্ধ হয়েই ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (তাদের ভাষায় ইসলাম ধর্ম বিরোধী) হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে হামলার ষড়যন্ত্রের ঘটনায় গ্রেফতার কাজী রেজওয়ানুল আহসান নাফিসও জসিম উদ্দিন রাহমানীর বক্তব্য শুনে আনসার আল ইসলামে যোগ দেয়। নাফিস নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল। হিযবুত তাহরীর থেকেই সে জিহাদি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে নাফিস, রানা ও জুন্নন (বর্তমানে সিরিয়ায়) নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আনসার আল ইসলামে যোগ দেয়। এরাই আনসার আল ইসলামের স্লিপার সেল পরিচালনা করত। ২০১২ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নাফিস এক হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা মেরে ফেডারেল ব্যাংক উড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে তার ৩০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, রানা রিমান্ডে নাফিসের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকার তথ্যের পাশাপাশি মালয়েশিয়া থাকতে আরো যেসব জঙ্গির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সেসব তথ্যও দিয়েছে।
রানা রিমান্ডে জানিয়েছে, আনসার আল ইসলামের সামরিক কমান্ড থেকে নির্দেশ দিলেই তার অধীনে থাকা স্লিপার সেলের সদস্যদের প্রস্তুত হতে বলতেন। ডার্ক ওয়েভের মাধ্যমে কখনো মেজর জিয়া আবার কখনো স্লিপার সেলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ হতো। অবস্থান ও সুযোগ বুঝে হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হতো। পরিকল্পনার মধ্যে উত্তরায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, মাদারীপুরে কলেজ শিক্ষক রিপন চক্রবর্তী ও মনিপুর স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষককে হত্যা ব্যর্থ হয়। সেই সঙ্গে হামলার টার্গেটে থাকা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে সবার আগে হত্যার পরিকল্পনা ছিল সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে। এরপর ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা, একজন সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী (তিনি ইতোমধ্যে মারা গেছেন)সহ ১২ জনকে হত্যার টার্গেট করে ২০১৩ সালে। ওই বছরে ১৩ ফেব্রুয়ারি তাদের তালিকাভুক্ত ব্ল­গার আহমেদ রাজীব হায়দারকে খুন করার পর তারা কিছুটা চাপে পড়ে যায়। সে সময় আনসার আল ইসলামের প্রধান মুফতি জসীমউদ্দীন রাহমানী তার খুতবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন অনুসারীদের কাছে প্রচার করতে থাকে। রাহমানী তার খুতবায় একশ্রেণির ব্যক্তিকে ইসলামের শত্রু আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যা করতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয় মেজর জিয়া। রাহমানীর খুতবা থেকে লেখক, প্রকাশক, ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আনসার আল ইসলামের সদস্যদের নজরদারি এবং তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়।
রানা আরো জানান, রাজীব হত্যার পর ২০১৪ সালে নতুন পাসপোর্ট তৈরি করে স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় যান তিনি। সেখানে তার নর্থ সাউথের বন্ধু জুন্নুন সিকদারের সঙ্গে মিলিত হয়ে আইএসের দীক্ষা নেন। মালয়েশিয়া থেকে ডার্ক ওয়েভের মাধ্যমে মেজর জিয়ার সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করতেন।
এদিকে, রানার কাছ থেকে উদ্ধার করা মোবাইল ফোনসেট ও ল্যাপটপ পরীক্ষার জন্য পুলিশ সিআইডি’র ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়েছে।

LEAVE A REPLY