তৈরি পোশাকের রফতানি আয়ের একটা বড় অংশ চলে যায় এর প্রধান কাঁচামাল সুতা ও কাপড় আমদানিতে। সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন এই সুতা ও কাপড়ের একটা বড় জোগান মিলবে দেশি পাট থেকেই। গবেষণার মাধ্যমে পাটের আঁশ থেকে মিহি ও উন্নতমানের সুতা উৎপাদনের প্রক্রিয়া চলছে। তৈরি পোশাকের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, পাট থেকে উন্নত সুতা পাওয়া গেলে তা হবে দেশের রফতানি বাণিজ্যের জন্য বড় সুখবর। তুলানির্ভর আমদানির পরিবর্তে পাটের সুতা ব্যবহার করা গেলে সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

মূলত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে পাটের পুনরুজ্জীবন এবং আধুনিকায়নের ঘোষণার পর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার ফলে দুই বছর ধরে পাটের উৎপাদন ও রফতানিতে সুদিন ফিরতে শুরু করেছে। গত বছরের ৬ মার্চ পাট আইন বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত এক অনুুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবছর ৬ মার্চকে জাতীয় পাট দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। সে হিসেবে কাল সোমবার দেশে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে দেশে-বিদেশে আট দিনের জমকালো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সংশ্লিষ্টদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ এবং পাটমেলা উদ্বোধন করবেন। রাজধানীসহ দেশের সব ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহরে পাটচাষিসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও আলোকসজ্জা করা হচ্ছে। বিদেশেও বাংলাদেশ মিশনে পাটপণ্যের প্রদর্শনী হচ্ছে। অর্থনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে পাটের সম্ভাবনা বিকাশের উদ্দেশ্যে পাটচাষি, শ্রমিক উদ্যোক্তা, কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের উৎসাহিত করা এবং কার্যক্রমের সমন্বয় বাড়ানোই দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য।

পাটের অর্থকরী ব্যবহার বাড়াতে নিবিড় গবেষণা করছে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। তোষা ও দেশি পাটের জিনগত গঠন (জেনোম কম্পোজিশন), অর্থাৎ বীজের গুণগত মান, আঁশ, উৎপাদন ও রোগ-বালাই সম্পর্কে জানা গেছে। এর মাধ্যমে আরও জানা যাবে, কোন কোন জিনগত বৈশিষ্ট্য বদলালে তা তৈরি পোশাকের ব্যবহৃত কাপড়ের সুতার মতো সূক্ষ্ম করা সম্ভব হবে। একদল গবেষক পাটের আঁশ থেকে অতি মিহি সুতা বানানোর প্রক্রিয়ায় সফলতা পেয়েছেন। এখন আঁশকে সূক্ষ্ম সুতায় পরিণত করার শেষ ধাপে রয়েছেন তারা। এই গবেষণার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে। গত ৩১ জানুয়ারি এই আবিষ্কার কাহিনী বিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল নেচার প্ল্যান্টে প্রকাশ করা হয়। প্রয়াত জিন বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে এ গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মনজুরুল আলম এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জানতে চাইলে সমকালকে তিনি বলেন, পাটের আঁশ থেকে তৈরি পোশাকের উচ্চমূল্যের (হাইয়ার ইন্ড) শার্টিং, স্যুটিং উৎপাদন উপযোগী সুতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গবেষণা করছেন তারা। কত দ্রুততম সময়ে গবেষণা থেকে সুতা উৎপাদন পর্যায়ে আসা যায়, সে উদ্দেশ্যে রাত-দিন কাজ করছে তাদের একটি গবেষণা দল। তিনি বলেন, তাদের আবিষ্কারের ফলে এরই মধ্যে ডেনিম উৎপাদনে এখন দেশি পাট ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগে থেকেই সুতামিশ্রিত কাপড় তৈরিসহ অন্যান্য কাপড় উৎপাদনে পাটকে কাজে লাগানো হচ্ছে। এর বাইরেও পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে নিবিড় গবেষণা চলছে বলে জানান তিনি।

পাটের সুতায় রফতানিমুখী তৈরি পোশাক উৎপাদন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান সমকালকে বলেন, পাট গোটা অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। পাটের সুতায় বিশ্বমানের উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের অপেক্ষায় আছেন উদ্যোক্তারা। উৎপাদন ব্যয় কমলে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়বে তৈরি পোশাক খাতের। এ জন্য হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্বাধীনতার পর পাট ছিল প্রধান অর্থকরী ফসল। নানা কারণে সোনালি আঁশের গৌরব হারিয়ে যাচ্ছিল। হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে পাটের বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার বাড়ছে। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের আবিষ্কার করা পাটের পাতার চা এখন রফতানি হচ্ছে। পাটকাঠি পুড়িয়ে উৎপাদিত ছাই দিয়ে তৈরি হচ্ছে কার্বন বা চারকোল। সব ধরনের কালি উৎপাদন, প্রসাধনী তৈরিসহ অন্যান্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যে চীনসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে এই চারকোল। পাটগাছের মূল দিয়ে তৈরি হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। অত্যাধুনিক জেট বিমান থেকে সাধারণ খেলনাসহ প্র্রায় সব পণ্যেই এখন কোনো না কোনোভাবে পাটের ব্যবহার হচ্ছে। অন্তত এক হাজার বহুমুখী পণ্য তৈরি হচ্ছে পাট দিয়ে। প্রচলিত ব্যবহারের পাশাপাশি বহুমুখী ব্যবহারের ফলে পুনরুদ্ধার হচ্ছে রফতানি বাজার। আবাদ, উৎপাদন ও দর বেড়েছে পাটের। বাংলাদেশের ইতিহাসে গেল মৌসুমে মণপ্রতি সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে কাঁচা পাট। সঙ্গে পাটকাঠির মূল্য সংযোজনের ফলে মণপ্রতি দর দাঁড়ায় চার হাজার টাকায়।

প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম সমকালকে বলেছেন, ‘পাটের অর্থকরী মূল্য এমন হতে চলেছে যে কৃষকরা রাত জেগে ক্ষেত পাহারা দিতে বাধ্য হবেন।’ তিনি বলেন, পাট এখন আর কেবল কৃষিপণ্য নয়। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের মূল্য সংযোজনকারী শিল্প। পাট একদিকে কৃষকের জীবন-জীবিকা; অন্যদিকে বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বাড়ানোর যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে সরকার বদ্ধপরিকর। যে কোনো মূল্যে পাটের সোনালি সুুদিন ফেরানো হবেই।

পুনরুদ্ধার হচ্ছে রফতানি বাজার: একসময় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস ছিল পাট। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে রফতানি আয়ে ৯০ শতাংশই ছিল পাটের অবদান। বছর বছর কমে এ হার ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে আবার পুনরুদ্ধার হচ্ছে পাটের রফতানি বাজার। গেল অর্থবছরে মোট রফতানি আয়ে পাটের অবদান বেড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি আগের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা থেকে আয় বেশি হয়েছে ৫ শতাংশের মতো। এ তথ্যের বাইরে হস্তশিল্প হিসেবেও অনেক পাটপণ্য রফতানি হচ্ছে। সেসব বিবেচনায় নিলে পাটের প্রকৃত রফতানি আয় আরও বেশি। বর্তমানে ১১৮ দেশে বহুমুখী পাটপণ্য রফতানি হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সমকালকে বলেন, পাটের বাজার সম্প্রসারণের আরও সুযোগ রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্তত ১০টি দেশে পলিথিন নিষিদ্ধ। ২৮ দেশের এই জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী বছর থেকে ইইউর সব দেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। সব দেশেই পরিবেশ সচেতনতায় পাটসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক আঁশে তৈরি পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা এখন ব্যাপক। তিনি বলেন, দেশে আগের মতো এখনও বিশ্বের সেরা মানের পাট উৎপন্ন হয়। ফলে পাটের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে ব্যয়সাশ্রয়ী উৎপাদন করা হলে শ্রমঘন শিল্প হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পাট।

বহুমুখী পাটপণ্যের বড় উদ্যোক্তা ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডের এমডি রাশিদুল করিম মুন্না সমকালকে বলেন, বিশ্ববাজারে বছরে শুধু শপিং ব্যাগের চাহিদা ৫০ হাজার কোটি পিস। বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট নিয়ে এর বড় একটা অংশের জোগান দেয় ভারত। বাংলাদেশের অবদান এখনও নামমাত্র। নিজেদের কাঁচামালের সুবিধায় সাশ্রয়ী দামে রফতানি বাজারে জায়গা করে নেওয়ার বিশাল সম্ভাবনা বাংলাদেশের সামনে।

বাড়ছে আবাদ ও অভ্যন্তরীণ বাজার: রফতানি বাজারের সঙ্গে দেশে পাটের আবাদ, ব্যবহার ও দর বাড়ছে ব্যাপক হারে। বছরে ৭০০ কোটি টাকার জাল আকৃতির পাটের চট বা জিও টেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি হয়েছে দেশে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, রেল, সড়কসহ সরকারি বিভিন্ন বিভাগের টেন্ডারে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হিসেবে জিও টেক্সটাইলের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কাজে ব্যবহারের সুযোগ থাকলে পাটপণ্য ব্যবহারের নির্দেশ রয়েছে সরকারের। অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান এখন পাটের তৈরি কাগজ, ফাইলসহ বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করছে।

অভ্যন্তরীণ বাজার আরও বাড়াতে আইন করে ১৭ পণ্যের পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাটচাষির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, মানসম্মত পাট উৎপাদন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে। অর্থনীতিতে পাটকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পাটনীতি করা হয়েছে। এতে পাটপণ্য বহুমুখীকরণ, পাটকলের আধুনিকায়ন ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণসহ কয়েকটি বিষয় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাটপণ্যকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রফতানিতে প্রণোদনা, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে ৭৬টি পাটকল ছিল। এখন এ সংখ্যা মাত্র ২৬টি। পুরনো যন্ত্রপাতির কারণে উৎপাদনক্ষমতা এখন অর্ধেকেরও কম। এসব কারখানা আবার পুরোদমে উৎপাদনে নিয়ে আসতে চীনের সহায়তায় মিলগুলোর আধুনিকায়নের কাজ চলছে। উন্নত মানের বহুমুখী পাটপণ্যের প্রদর্শন এবং বিক্রির জন্য স্থায়ী কেন্দ্র খোলা হয়েছে রাজধানীর ফার্মগেটে। এ কেন্দ্রের মাধ্যমে পাটের প্রান্তিকসহ সব উদ্যোক্তার পণ্য রফতানিতে নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয়ভাবেও বেচা-বিক্রি চলছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছর ছয় লাখ ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। এবার হয়েছে সাত লাখ ৫৭ হাজার হেক্টর জমিতে।

এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ: পাটের অর্থনীতি ফেরাতে এতসব উদ্যোগ এবং সম্ভাবনা সত্ত্বেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে এখনও। বহুমুখী পাটপণ্যের সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়ে সম্প্রতি একটি পেশাদার জরিপ চালিয়েছে ইপিবি। বেসরকারি সংস্থা মাইডাস ইপিবির হয়ে এ জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে পাটের বাজার সম্প্রসারণে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে পণ্যের বৈচিত্র্যহীনতা, বিপণন কৌশলে দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিংয়ে ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া পাটকলগুলোতে ৬০ শতাংশ দক্ষ শ্রমিকের অভাব, সরকারি মিলে ট্রেড ইউনিয়নের দৌরাত্ম্য, প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোকবলের চাপ এবং পাট চাষে বীজের সংকটকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাইডাসের এমডি ড. এস এম মশিউর রহমান বলেন, জরিপে তারা দেখেছেন, মৌসুমের শুরুতে পাট না কিনে মৌসুম শেষে পাট ক্রয়ের কারণে দর বেশি দিতে হয়। বাড়তি এ অর্থ যায় মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের পকেটে। এসব কারণে সরকারি মিলগুলো বছরের পর বছর লোকসানে চলছে।

LEAVE A REPLY