রাশিয়ায় যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা সিলভার রোজ-এর প্রতিষ্ঠাতা ইরিনা মাসলোভা। ছবিটি সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে তোলা। ছবি: এএফপিসম্প্রতি

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর দেশের যৌনকর্মীদের সম্পর্কে বলেছিলেন, রাশিয়ার যৌনকর্মীরাই ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও সেরা’। কিন্তু আদতে তা নয়, বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ, দেশটিতে পতিতাবৃত্তি এখনো স্বীকৃতি পায়নি; তা অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ছাড়া সেখানকার যৌনকর্মীরা অসহায় ও মানবেতর জীবন যাপন করেন। তাঁরা হামেশাই নির্যাতনের ও সংক্রমণের শিকার হন। আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তারপরও পেটের দায়ে যৌনকর্মীরা সেখানে এই পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন। বার্তা সংস্থা এএফপির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।মার্কিন নির্বাচনের আগে রাশিয়া সফরে গিয়ে বিখ্যাত একটি হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুইটে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে তিনি রাশিয়ার যৌনকর্মীদের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু প্রতিবেদনের এ তথ্য একদম নাকচ করে দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যৌনকর্মীদের সম্পর্কে সরস ওই মন্তব্য করেছিলেন। এরপরই এএফপি এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরি করে। গত রোববার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ার পতিতালয়গুলোতে প্রবেশে সবার অনুমতি নেই। আগে থেকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি নিয়েই কেবল সেখানে যাওয়া যায়। দেশটির সেন্ট পিটার্সবার্গের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি শহরের পুরোনো ভবনে স্যালন নাম দিয়ে পতিতালয় করা হয়েছে। সেখানে ইন্না নামের ৩০ বছর বয়সী একজন নারী অভ্যর্থনাকারী হিসেবে কাজ করেন। রাশিয়ায় যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করে সিলভার রোজ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী রেজিনা আখমেতজানোভা সঙ্গে ছিলেন বলেই তাঁরা এএফপির সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছিলেন। রেজিনা প্রতিদিন বিকেলে পতিতালয়গুলোতে গিয়ে জন্মনিরোধক কনডম সরবরাহ ও যৌনকর্মীদের এইচআইভি পরীক্ষা করানোর কাজ করেন। ওই পতিতালয়ে ঢুকে দেখা যায়, নাদিয়া নামের একজন রান্নাঘরে কাজ করছেন। আর নাসতিয়া (৩১) ও মদিনা (২০) নামের দুই কর্মী গল্প করতে করতে চা খাচ্ছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্প্রতি রাশিয়ায় যৌনকর্মীদের সংক্রমণের হার অনেক বেড়ে গেছে। ২০১৬ সালেই এ-সংক্রান্ত ১০ লাখ ৩০ হাজার সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। যৌনকর্মীদের অভিযোগ, তাঁদের নানা ধরনের চাপ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে অনিরাপদ শারীরিক সংসর্গ করতে বাধ্য করা হয়।

যৌনকর্মী মদিনা এখানে এসেছেন উজবেকিস্তান থেকে। এত দিনে রাশিয়ার প্রাথমিক ভাষাটা তিনি রপ্ত করে ফেলেছেন। তিনি বলেন, ‘অনিরাপদ শারীরিক সংসর্গ করতে তাঁরা (খদ্দের) আমাকে জোর করে, মারধর করে। ছুরি দেখিয়ে হুমকিও দেয়।’

আরেক যৌনকর্মী নাসতিয়া এসেছেন রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় উরাল অঞ্চল থেকে। তিনি বলেন, ‘খদ্দেরদের সঙ্গে আমাকে বিভিন্ন সময় আরও জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। তবে আমি যে তাদের ভয় পাই, এটা কোনোভাবেই না দেখানোটা আমি রপ্ত করেছি।’

বেসরকারি সংস্থা সিলভার রোজের প্রতিষ্ঠাতা ইরিনা মাসলোভা বলেন, ‘রাশিয়ার যৌনকর্মীরা প্রকৃত অর্থেই সমাজচ্যুত। নিজেদের রক্ষা করতে তাঁদের বৈধ কোনো পথ নেই।’

৪০ বছর বয়সী এই মাসলোভার জীবনের গল্পটা অন্য রকম। জীবনের তাগিদে তিনিও টানা ছয় বছর যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। পরে ২০০৩ সালে তিনি যৌনকর্মীদের অধিকার আদায়ে লড়াই শুরু করেন। যৌনকর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন, এমন অল্প কয়েকজন অধিকারকর্মীর মধ্যে এই মাসলোভা এখন একজন হয়ে উঠেছেন। তিনি বলেন, রাশিয়ায় পতিতাবৃত্তি অবৈধ ও জরিমানাযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের জরিমানা ২ হাজার ৬২৪ ইউরো (প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার ১২৮ টাকা)। এই অপরাধের প্রাথমিক সাজা তিন বছরের কারাদণ্ড। তবে অভিযোগ গুরুতর হলে অর্থদণ্ডও করা হয়।

মাসলোভা বলেন, যৌনকর্মীরা অভিযোগ করলে পুলিশ তা গুরুত্ব নিয়ে তদন্তও করত না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা বলেছি, আমাদের পেশা এভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মানে একদিকে সরকার আমাদের পক্ষে নয়, অন্যদিকে আমাদের পেশা আইনগতভাবে অপরাধ। এ কারণে যৌনকর্মীরা যেকোনো সুরক্ষার বাইরে এবং তাঁদের কোনো অধিকারও নেই।’

সংস্থাটির প্রধান বিশ্বাস করেন, পতিতাবৃত্তি পেশাকে বৈধতা দিলে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। এ ছাড়া যৌনকর্মীদের জন্য একটি ইউনিয়নও গঠন করতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সোভিয়েত ইউনিয়নে পতিতাবৃত্তি ছিল না। তবে ১৯৮০ সালের শেষের দিকে অল্প মাত্রায় তা শুরু হয়। তখন এই পেশার মানুষেরা শুধু বিদেশিদের টার্গেট করতেন এবং তাঁদের কাছ থেকে উচ্চ মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা পারিশ্রমিক নিতেন। ১৯৯০ সালের দিকে মস্কোর রাস্তায় প্রকাশ্যে এই পেশা চালাতেন অনেকেই। ২০০০ সালের পর আবাসিক এলাকায় বাসা ভাড়া করে মেয়েরা একসঙ্গে থাকা শুরু করেন। সেখানেই ধীরে ধীরে পতিতালয় গড়ে ওঠে। আর তাঁদের নিরাপত্তা দেয় দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশরা।

২০১৫ সালে রাশিয়ার কমারসেন্ট বিজনেস ডেইলির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশটির পতিতালয়গুলোতে গোপনে পুলিশ বিভাগ, বিশেষ করে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা নিরাপত্তা দেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে চার হাজার থেকে ছয় হাজার নারী পতিতাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন।

রেজিনা আখমেতজানোভা বলেন, ‘এঁদের মধ্যে নানা ধরনের নারী আছেন। কেউ শিক্ষার্থী, কারও বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে আর কেউবা গৃহিণী। গৃহিণীদের দাবি, তাঁদের এই পেশার ব্যাপারে স্বামীরা ঘুণাক্ষরেও কিছু জানেন না।’

এঁদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ নারী রাস্তায় পতিতাবৃত্তি করেন। আর বাকিরা কোনো অ্যাপার্টমেন্টে গোপনে পতিতালয় বানিয়ে থাকেন। সেখানে তাঁদের জন্য একজন নিরাপত্তারক্ষী ও একজন অভ্যর্থনাকারী থাকেন। অভ্যর্থনাকারীরাই মূলত খদ্দেরদের সঙ্গে আলোচনা করেন। কোনো ভবনের দেয়াল, বাস বা বাসস্ট্যান্ডে ‘অবসর’ ও ‘গার্লস’ লেখা ছোট্ট বিজ্ঞাপন দেখেই খদ্দেররা ফোন করেন। কখনো বা শুধু কোনো নারীর নাম ও ফোন নম্বর দেওয়া থাকে। পতিতালয়ের কোনো মেয়ে যখন ফোনে রাজি হয়ে যান, ঠিক তখনই রেজিনা আখমেতজানোভা ওই মেয়ের এইচআইভি পরীক্ষা করানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে যান।

সেন্ট পিটার্সবার্গের এই পতিতালয়টিতে নাসতিয়া, মদিনা ও নাদিয়া কাজ করেন। প্রতি রাতে তাঁদেরকে ১০ থেকে ১৫ জন খদ্দেরের সঙ্গে সময় কাটাতে হয়। এই তিনজনের মধ্যে খদ্দের যাকে পছন্দ করেন কেবল তার সঙ্গেই সময় কাটান তিনি। আর এর জন্য প্রতি ঘণ্টায় পারিশ্রমিক হিসেবে তাঁরা পান মাত্র ৩৪ ডলার (প্রায় ২ হাজার ৭২৫ টাকা)।

৩৪ বছর বয়সী নাদিয়া বলেন, ‘যে কাজই করি না কেন, আমরাও তো মানুষ। সবাই আমাদের রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ মনে করেন—এটুকুই আমাদের চাওয়া।’

LEAVE A REPLY