বাগানের মেঠো পথ দিয়ে কয়েক পা হাঁটলেই একতলা একটা ভবন, যার মাঝখানে একটি গম্বুজ। প্রথম কেউ দেখলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল মনে করে ভুল করতে পারেন। কিন্তু আসলে এটি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা। ১৯৩০ সালে আজিমপুরের এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এতিমখানার মূল ভবনেই পুরোনো এই ছবিটি পাওয়া গেল। ১৯৩১ সালের ১০ আগস্ট বাংলার গভর্নর স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসনের স্ত্রী লেডি জ্যাকসন এই ভবনের উদ্বোধন করেন। তবে স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানাটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯০৯ সালে। খাজা সলিমুল্লাহই এটি নির্মাণ করেছিলেন। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, বাল্যকাল থেকেই আভিজাত্যের প্রাচীর ডিঙিয়ে খাজা সলিমুল্লাহ সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মিশতেন। ১৯০১ সালে পিতা নওয়াব স্যার খাজা আহসানুল্লাহর মৃত্যুর পর জীবিত জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে তিনি ঢাকা নওয়াবের কর্তৃত্ব লাভ করেন। ১৯০৯ সালে নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ আহসান মঞ্জিলের পাশে কুমারটুলির একটি ভাড়া বাড়িতে এতিমখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এতিমখানার পরিসর বাড়লে ১৯১৩ সালে এটিকে লালবাগের কাছে আজিমপুরে স্থানান্তর করা হয়। ওই বছরই গভর্নর লর্ড কারমাইকেল এতিমখানাটি পরিদর্শন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নবাব সলিমুল্লাহই এতিমখানার যাবতীয় খরচ দিতেন। ১৯১৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর এতিমখানা অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। তখন ঢাকার অনেকেই আর্থিক সহযোগিতা করেন। এ সময়ে এতিমখানার নামকরণ করা হয় স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানা। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় আর্থিক সংকটে পড়লে সলিমুল্লাহর প্রথম সন্তান নওয়াব খাজা হাবিবুল্লাহ বাহাদুরকে এতিমখানার কমিটির সভাপতি এবং মৌলভী চৌধুরী ফরিদ উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এই কমিটি আজিমপুরের বর্তমান জায়গায় ২১ বিঘা জায়গা কিনে সেখানে এতিমখানাটি প্রতিষ্ঠান করেন। ১৯৫৮ সালে নওয়াব খাজা হাবিবুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মেজর নবাব খাজা হাসান আসকারী এতিমখানার সভাপতি হন। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি এতিমখানাটি চালালেও পরে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। ইতিমধ্যে কয়েক দফায় কমিটি বদলায়। ২০০৩ সালে সেই সময়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি এতিমখানার দুই বিঘা জমি একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দিলে শিক্ষার্থীরা আদালতে যায়। আদালত ওই ভবনসহ জায়গা এতিমখানাকে ফিরিয়ে দিতে বলেন। ২০০৮ সালের ২ জানুয়ারি সরকার কমিটি বিলুপ্ত করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে সলিমুল্লাহ এতিমখানা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। বর্তমানে ঢাকা জেলা প্রশাসক এতিমখানাটি দেখভাল করছেন। এই এতিমখানায় কেজি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত অনাথ ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে। এখানকার শিক্ষার্থীরা এখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছেন। ইডেন কলেজের পর আজিমপুরের রাস্তাটি এখনো এতিমখানা রোড নামেই পরিচিত। কেউ চাইলেই ঘুরে দেখতে পারেন শতবছরের এই এতিমখানা।

LEAVE A REPLY