কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) মেয়র পদ দখল করতে সর্বোশক্তি নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও মাঠের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। আওয়ামী লীগ দলীয় কোন্দল মিটিয়ে ফেলার পাশাপাশি মহাজোটের সমীকরণ পাকাপোক্ত করছে। বিএনপি পাশে পাচ্ছে শরিক ২০ দলকে। দুই দলই কেন্দ্রীয় দুই নেতাকে তাদের মেয়র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দিয়েছে। তাদের সঙ্গে থাকছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। গতকাল সোমবার কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ৩০ নেতা কুমিল্লার নেতাকর্মীদের নিয়ে সভা করছেন। আগামীকাল কুমিল্লায় আসছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। কুসিকে দলীয় মেয়র প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে বিজয়ী দেখতে চায় আওয়ামী লীগ। এ জন্য তারা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নেওয়া দলীয় কৌশল অবলম্বন করছেন। বিএনপিও আটঘাট বেঁধে নেমেছে মাঠে। সীমার প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার কাজী জাফর উল্লাহ কর্মিসভায় নেতাকর্মীদের নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ রাখতে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বিএনপির মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তার দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ইতোমধ্যেই কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন কুমিল্লায়। তিনি দলের নেতাকর্মীদের ঘরে বসে না থেকে প্রার্থীর পক্ষে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল সোমবার কুমিল্লা টাউন হল মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের কর্মিসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রেসিডিয়াম মেম্বার কাজী জাফর উল্লাহ। তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী নৌকার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে তাকে অনেক কষ্ট পেতে হবে। নেত্রী যাকে নির্বাচনের জন্য নৌকা প্রতীক দিয়েছেন, আমাদের সবাইকে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে কাজ করতে হবে। দিনে নৌকা, রাতে অন্য কিছু করবে এমন ঘটনা কখনো আওয়ামী লীগে বরদাস্ত করা হবে না। তিনি আরও বলেন, আমরা আগামী ৩০ মার্চ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মাঠে থেকে ভোটারদের কাছ থেকে নেত্রীর নির্দেশে ভোট ভিক্ষা নিয়ে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করে ঘরে ফেরব। আমরা কুমিল্লা এসেছি নির্বাচন করতে নয়; কুমিল্লাবাসীর পাশে দাঁড়াতে, উন্নয়নের পাশে দাঁড়াতে।

কুসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের কুমিল্লা জেলা, মহানগর কমিটি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেকাকর্মীদের নিয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীমের সভাপতিত্বে সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নেতা সুজিত রায় নন্দী, মেয়র প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা, আলহাজ মো. ওমর ফারুক, আওয়ামী লীগ নেতা সফিকুল ইসলাম সিকদার, আরফানুল হক রিফাত, নূর-উর-রহমান মাহমুদ তানিম, কবিরুল ইসলাম সিকদার প্রমুখ।

কাজী জাফর উল্লাহ বলেন, আজকের এ সভায় বারবার ঐক্যবদ্ধতার প্রশ্ন এসেছে। নৌকার প্রশ্নে এক ঐক্যবদ্ধতার প্রশ্ন আসবে কেন? শেখ হাসিনার প্রশ্নে এবং নৌকার প্রশ্নে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। অনৈক্য থাকতে পারে না। সবাই এক হয়ে ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনে নৌকাকে বিজয়ী করাতে হবে।

সভায় কুমিল্লার স্থানীয় নেতারা বলেন, আজকের সভায় যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সবাই কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা যেন ঠিক থাকে। নেতাকর্মীদের কথা আর কাজ যেন এক হয়। সভায় কথা দিয়ে আবার বাইরে গিয়ে তা ভুলে গেলে চলবে না। সভায় আঞ্জুম সুলতানা সীমা সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, নৌকার বিজয় নিশ্চিত না করে ঘরে ফেরা যাবে না।

আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনার জন্য কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডে ২৭ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে স্থানীয়দেরও সম্পৃক্ত করা হয়ে।

গণভবনে হাজী বাহার

আওয়ামী লীগের প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমার পক্ষে নৌকার বিজয়ে কাজ করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার প্রধানমন্ত্রীকে কথা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন কুসিক নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব এ কে এম এনামুল হক শামীম। গতকালের কর্মিসভায় তিনি এ কথা জানান। শামীম বলেন, রোববার রাত সাড়ে ৮টায় হাজী বাহার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে আমিও ছিলাম। বৈঠকে হাজী বাহার প্রধানমন্ত্রীকে কথা দিয়ে বলেছেন, নৌকার বিজয় এনে সীমাকে নিয়ে তিনি গণভবনে যাবেন।

আগামীকাল আসছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে আগামীকাল বুধবার কুমিল্লায় আসছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির নেতারা। গতকাল দলের একটি সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, ১৫ মার্চ কুসিক নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রচারণা শুরু হবে। আর বিএনপি চায় কমিল্লায় তাদের প্রচার-প্রচারণা খুব জোরেশোরে শুরু করতে। সে জন্যই ওই দিন থেকে দলের কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্যরা কুমিল্লায় অবস্থান নেবেন। সেই সঙ্গে ২০ দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী এলডিপির মহাসচিব অ্যাডভোকেট রেদায়ান আহমেদের নেতৃত্বে আরও একটি দল ওই দিন কুমিল্লা আসতে পারে।

বিএনপি দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি চায় কুমিল্লায় তাদের এ আসনটি ধরে রাখতে। এ ক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক ও প্রার্থী সাক্কুর জনপ্রিয়তাকে ভালোভাবেই কাজে লাগাতে চায় তারা।

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় দেখতে চান। আর সে জন্যই ২০ দল ও বিএনপি নির্বাচনের এ বৈতরণী পার হতে পৃথক পৃথকভাবে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে।

কুসিক নির্বাচন প্রশ্নে কুমিল্লা বিএনপি এখন ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। দলটির বিবদমান হাজী আমিনুর রশিদ ইয়াছিন ও মনিরুল হক সাক্কু গ্রুপ এখন এক অন্যের হয়ে কাজ করছে। নির্বাচনে মনিরুল হক সাক্কুর বিজয়কে নিশ্চিত করতে ইয়াছিন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও নিয়েছেন। ঢাকা থেকে আসা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজটিও তার হাতেই রয়েছে। আগামীকাল থেকে আসা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে হাজী অমিনুর রশিদ ইয়াছিনও থাকবেন বলে জানা গেছে। তবে মামলার কারণে তিনি এখন অনেকটা আড়ালে রয়েছেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা কুমিল্লা এসে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের কাছে যাবেন। তারা ভোট প্রার্থনা করবেন দলীয়ভাবেই।