ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের স্পেশাল কেয়ার বেবি ইউনিটে (স্ক্যাবু) চিকিৎসাধীন ছিল কন্যা শিশুটি। তবে পাশে ছিল না কোনো স্বজন। হাসপাতালের খাতায় তার কোনো নামও ছিল না। লেখা আছে ‘আননোন’। তবুও কোনো কমতি ছিলনা শিশুটির যত্ন বা চিকিৎসার। তার নাম দেওয়া হয়েছিল আনিশা। কেউ ডাকত জয়তী নামে। ওই শিশুটিকে সন্তান হিসেবে পেতে চেয়েছিল চারটি দম্পতি। চলছিল আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। তবে সবার সব চেষ্টা, আর আশাকে হতাশায় ডুবিয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে সেই শিশুটি!

রাজধানীর মিরপুর নবাবেরবাগ বেড়িবাধের ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পাওয়ার পর আলোচনায় উঠে আসা শিশু আনিশা গত রবিবার রাতে মারা গেছে। ঘটনাটি গত দু’দিন প্রকাশ পায়নি। আজ মঙ্গলবার খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডাঃ মনিষা ব্যানার্জী। তিনি বলেন, ‘শিশুটি জন্মের পর থেকে নানা সংক্রমনে ভুগছিল, ওজন ও কমছিল। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা করতে পারিনি। গত রবিবার রাতে শিশুটি (আনিশা) মারা যায়। ’

গত ১১ মার্চ মিরপুরের শাহআলী থানার নবাবেরবাগ বেড়িবাঁধের ডাস্টবিন থেকে পলিথিনে মোড়ানো শিশুটিকে দেখে পুলিশে খবর দেন বাশ ব্যবসায়ী বিপ্লব হোসেন ও তার স্ত্রী লিপি আক্তার। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিপ্লব হোসেন দাবি করেন, তার বাঁশের দোকানটি থেকে কিছু দূরেই ময়লা ফেলার জায়গা, যেখানে নবজাতকটিকে দেখেন তারা। পরে পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার করেন। বিপ্লব ও তার স্ত্রী-ই প্রথম শিশুটিকে দত্তক নিতে চান। পরে আরো তিন দম্পতি আদালতের কাছে শিশুটিকে নিজের সন্তান হিসেবে পেতে আবেদন করেন। গত ২১ ও ২৯ মার্চ শুনানি হয়। আগামি রবিবারও শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল। এরই মধ্যে শিশুটির মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন বিপ্লব। তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলে আছে। ওকে মেয়ে হিসেবে পেতে চাইছিলাম। নাম রাখছিলাম-   আয়শা সিদ্দিকা জয়তী। আল্লাহ পাক তাকে নিয়ে গেল…। ‘

এক নার্স বলেন, ‘কয়েকজন এসে শিশুটির খোঁজ নিয়ে যায়। ডাক্তাররাও খোঁজ রাখতেন। তারই শিশুটির নাম রাখেন- আনিশা। সে মারা যাওয়ায় আমাদের অনেক খারাপ লেগেছে। বাচ্চা হিসেবে যারা নিতে চাইছিল- তাদের ভাগ্যেই হয়ত ছিল না। ‘

হাসপাতাল সূত্র জানায়, যখন আনিশাকে পাওয়া যায়, তখন তার ওজন ছিল এক হাজার ৭০০ গ্রাম। সাধারণত নবজাতকের ওজন থাকে আড়াই থেকে চার হাজার গ্রাম। জন্ডিস ও শ্বাসকষ্ট ছিল শিশুটির। তার রক্তের অণুচক্রিকা (প্লাটিলেট) কমে যায়। খাবারও হজম করতে পারছিল না।

প্রসঙ্গত, গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ থানার কর্নেলহাট প্রশান্তি আবাসিক এলাকার আবর্জনার স্তূপ থেকে আরেক নবজাতককে উদ্ধারের পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুস্থ্য করে তোলা হয়। তার নাম দেতওয়া হয় একুশ। ওই শিশুটিকেও ১৬ দম্পতি নিতে চেয়েছিল। গত ২৯ মার্চ চট্টগ্রামের বিচারক জাকিরুল ইসলাম ও শাকিলা বেগম নামে এক দম্পতির কাছে একুশকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। জাকিরুল একজন চিকিত্সক। ৫ এপ্রিল একুশকে পায় শাকিলা-জাকিরুল।

এর আগে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কাফরুলের পুরাতন বিমানবন্দরের কাছে কুকুরে কামড়ানো একটি নবজাতকে তানিয়া আক্তার ও লিপি আক্তার নামে দুই নারী উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেক হাসপাতালে নিয়ে যান। সুস্থ্য করে তোলা ওই শিশুটির নাম রাখা হয় ফাইজা। ওই শিশুটিকেও দত্তক নিতে চায় বেশ কয়েকটি দম্পতি। তবে আদালতের সিদ্ধান্তে ওই বছরের ১১ অক্টোবর ফাইজাকে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়।