সম্প্রতি পাঁচটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে বেশ কজন নেতৃস্থানীয় ও বোমা তৈরিতে দক্ষ জঙ্গি নিহত হওয়ার পরও নব্য জেএমবি এখনো জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, জঙ্গিরা নাশকতার নতুন একটা পর্যায়ে গেছে, যেটার মূল বৈশিষ্ট্য হলো আত্মঘাতী হওয়া।

গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা-পরবর্তী অব্যাহত অভিযানের সাত-আট মাসের মাথায় এসে এই গোষ্ঠী আবার সংগঠিত হয়ে ভয়ংকর রূপে আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি এবং তাদের আত্মঘাতী হওয়ার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও কিছুটা উদ্বেগে ফেলেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন আত্মঘাতী প্রবণতাকে সাম্প্রতিক জঙ্গিবাদের তৃতীয় পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রথমে তারা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোকজন, ভিন্নমতাবলম্বীদের (সফট টার্গেট) মেরেছে। পরে হলি আর্টিজানের মতো সুসংগঠিত হামলা চালিয়েছে। এখন তৃতীয় ধাপে তারা যে পর্যায়ে আছে, সেটিকে আত্মঘাতী পর্যায় বলা যেতে পারে। তিনি বলেন, উদ্বেগজনক হচ্ছে, এ পর্যায়ে এসব জঙ্গির হামলার মূল লক্ষ্য হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, হলি আর্টিজানে হামলার পর দ্রুততম সময়ে তাঁরা জঙ্গিদের নেটওয়ার্কটা তছনছ করে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু তারা আবারও সংগঠিত হয়ে নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবার তারা ঢাকার বাইরে আস্তানাগুলো করেছে। অনেকটা কাকতালীয়ভাবে গত ৭ মার্চ কুমিল্লায় হাইওয়ে পুলিশের একটি চেকপোস্টে দুই জঙ্গি ধরা পড়ার পর নব্য জেএমবির প্রস্তুতির বিষয়টি জানাজানি হয়। ওই দুই জঙ্গির দেওয়া তথ্যেই পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দুটি জঙ্গি আস্তানা পাওয়া যায়। সীতাকুণ্ড থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দম্পতির তথ্যানুযায়ী সিলেটের আতিয়া মহল শনাক্ত করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সিলেটের আতিয়া মহলে সেনাবাহিনীর অভিযান চলাকালে নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে যে জোড়া বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, তার হামলাকারীকে খুঁজতে খুঁজতে মৌলভীবাজারের আস্তানা দুটির সন্ধান পাওয়া যায়।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, চট্টগ্রাম ও সিলেটের অভিযান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সীতাকুণ্ড ও সিলেটে আত্মঘাতী বা অভিযানে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নব্য জেএমবির বোমা বিশেষজ্ঞ বা বোমার কারিগরেরাও রয়েছে। এতে তাদের সাংগঠনিক কাঠামোটা দুর্বল হবে। তিনি বলেন, ‘তবে তাদের নেটওয়ার্ক একেবারেই শেষ হয়ে গেছে, তা বলা যাবে না। আর আমাদের যে সফলতা নেই, তা-ও নয়। বলা যায়, তারা যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তা আপাতত ভন্ডুল করে দেওয়া গেছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

গত ১৫ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, মৌলভীবাজারের বড়হাট ও নাসিরপুর এবং কুমিল্লার কোটবাড়ীতে জঙ্গিদের ভাড়া করা পাঁচটি বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়। এতে পাঁচ শিশু, পাঁচ নারীসহ ১৯ জন নিহত হয়। এদের ১৬ জনই আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই আস্তানাগুলোর প্রতিটিতেই প্রচুর বিস্ফোরক মজুত করা ছিল।

সিলেটের শিববাড়ি এলাকায় জঙ্গি হামলার পর সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কে হামলার স্থান হলুদ ফিতা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সতর্ক অবস্থানে পুলিশ। ছবিটি ২৬ মার্চ তোলা। ছবি: আনিস মাহমুদ।সিলেটের শিববাড়ি এলাকায় জঙ্গি হামলার পর সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কে হামলার স্থান হলুদ ফিতা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সতর্ক অবস্থানে পুলিশ। ছবিটি ২৬ মার্চ তোলা।

এই সময়ের মধ্যে জঙ্গিরা দুটি আত্মঘাতীসহ তিনটি হামলা চালিয়েছে। গত ১৭ মার্চ ঢাকার আশকোনায় র‍্যাব সদর দপ্তরের ব্যারাকে এবং ২৪ মার্চ আশকোনা পুলিশ বক্সের কাছে দুটি হামলায় দুই আত্মঘাতী জঙ্গিই নিহত হয়। আশকোনায় হামলার এক দিন পর ২৫ মার্চ সিলেটে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চলাকালে নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যেই জঙ্গিদের দুটি বোমায় নিহত হন র‍্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান আবুল কালাম আজাদ, পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ সাতজন।জঙ্গিবাদ বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খানের মতে, সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে জঙ্গিদের অনেক ক্ষতি হয়েছে, তার মানে এই নয় যে তারা সামর্থ্য হারিয়েছে। এখনো তাদের নাশকতা করার সক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহের অভিযানে যেটা লক্ষণীয়, সেটা হচ্ছে তারা পরিবার নিয়ে জঙ্গিবাদে যুক্ত হচ্ছে এবং পরিবারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গোপন কার্যক্রম চালাচ্ছে। যখন চিহ্নিত হচ্ছে, তখন তারা পরিবারসহ আত্মঘাতী হচ্ছে। প্রবণতাটা যেভাবে এগোচ্ছে, পরবর্তী সময়ে শুধু নারী জঙ্গিরা এককভাবে আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে।’

ডিএমপির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘এ প্রবণতা আসলেই উদ্বেগের। এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।’

জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক অভিযানগুলোর পর জঙ্গিদের সক্ষমতা কিছুটা কমেছে।’ তিনি বলেন, জঙ্গিদের কয়েকজন সংগঠক এখনো গ্রেপ্তার এড়িয়ে রয়েছে। তবে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রয়েছে। সিলেটে তাদের দখল থেকে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। সেগুলো সে রকম মানসম্মত নয়। হলি আর্টিজানে হামলার সময়ও তাদের কাছ থেকে একে-২২-এর মতো স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বোঝা যায়, এখন তাদের অস্ত্রের ভান্ডারেও টান পড়েছে।