নিজেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পরিচয় দিতেন। নামের পাশে বড় বড় ডিগ্রি এমবিবিএস (ডিএমসি), বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস (মেডিসিন), এমডি (নিউরোলজি) ও এফআরসিপি (লন্ডন) ডিগ্রি লেখা।

মুহাম্মদ খোরশেদ আলম নামের এই ব্যক্তি মাগুরা সদর হাসপাতালের পাশে গ্রামীণ ল্যাব মেডিকেল সার্ভিসেস নামের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিউরো মেডিসিন এবং মেডিসিন ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দুই মাস ধরে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। ভিজিট নিতেন ৫০০ টাকা। সপ্তাহে প্রতি বুধবার তিনি ঢাকা থেকে মাগুরায় এসে রোগী দেখেন।
তবে আজ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে শনাক্ত হলো, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক হওয়া তো দূরের কথা, তিনি আসলে অষ্টম শ্রেণি পাস এক ব্যক্তি। আর এই প্রতারণার জন্য আদালত আজই তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।
আজ সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ মো. ইসমাইল খান বলেছেন, ‘মুহাম্মদ খোরশেদ আলম নামে নিউরো মেডিসিনে কোনো শিক্ষক নেই। এ ব্যক্তি ভুয়া চিকিৎসক।’
মাগুরার সিভিল সার্জন মুন্সী মো. সাদুল্লাহ জানান, কিছুদিন আগে তাঁরা জানতে পারেন, খোরশেদ আলম নামের ওই ব্যক্তি কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নন। অষ্টম শ্রেণি পাস ওই ব্যক্তি ঢাকা মেডিকেলের একজন ওয়ার্ড বয়। মিথ্যা পরিচয়ে চিকিৎসাসেবার নামে তিনি প্রতারণা করছেন।
সিভিল সার্জন বলেন, ‘খোরশেদ আলম নামের ভুয়া ওই চিকিৎসক আজ সকালে রোগী দেখছিলেন এবং ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছিলেন। আমি সকালে সদর হাসপাতালের তিনজন কর্মচারীসহ দুজন মেডিকেল কর্মকর্তাকে ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাই। ভুয়া ওই চিকিৎসককে নানাভাবে ব্যস্ত রাখি। যেন তিনি বিপদ বুঝতে পেরে পালিয়ে যেতে না পারেন। ওই সময় বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানাই। জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠান। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে এক বছরের কারাদণ্ড দেন।’
ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাকিম নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দীপক কুমার দেব শর্মা বলেন, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গ্রামীণ ল্যাব মেডিকেল সার্ভিসেসে গিয়ে খোরশেদ আলমকে (৩৮) চিকিৎসাসেবা দিতে দেখি। পরে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করি। তিনি নিজেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দাবি করেন। তবে এর পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন।
দীপক কুমার দেব বলেন, ‘বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা বলে দাবি করলেও ওই ব্যক্তি সরকারি চাকরির আইডি নম্বর দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন নম্বরও তাঁর ছিল না। তাঁর ব্যবহার করা একটি প্যাডে সহকারী অধ্যাপক ও অন্যটিতে সহযোগী অধ্যাপক লেখা ছিল।’
আজকের অভিযানের একপর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া যায় মুহাম্মদ খোরশেদ আলম ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করছেন। এ সময় সদর হাসপাতালে দুজন চিকিৎসক, পুলিশ ও সেখানে জড়ো হওয়া লোকজনের উপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে পুলিশ তাঁকে মাগুরা কারাগারে পাঠায়। খোরশেদ আলমের দেওয়া তথ্যমতে, তিনি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের আবদুর রহিমের ছেলে।
যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণ ল্যাব মেডিকেল সার্ভিসেসের অন্যতম মালিক ও ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ তুষার হোসেন বলেন, ‘দুই মাস ধরে খোরশেদ আলম নিউরো মেডিসিন, মেডিসিন ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাঁর চিকিৎসার মান খুব ভালো। রোগীপ্রতি তিনি ৫০০ টাকা করে ফি নেন।’ তুষার হোসেন বলেন, ‘ফোনের মাধ্যমে আমরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাঁর সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। শুধু জানি, তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক। এখন বুঝছি তিনি ভুয়া চিকিৎসক।’
তুষার হোসেন আরও জানান, তাঁদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিবন্ধন হয়নি। তবে আবেদন করেছেন। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে মাগুরা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক সমিতি সাধারণ সম্পাদক খন্দকার ফরহাদ আহম্মদ বলেন, ‘গ্রামীণ ল্যাব মেডিকেল সার্ভিসেস আমাদের সমিতির তালিকাভুক্ত নয়। তাদের এখনো নিবন্ধন হয়নি।’
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা সময় সেখানে উপস্থিত মাগুরা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল কর্মকর্তা সুব্রত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, খোরশেদ আলম ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন ওয়ার্ড বয়। এর আগে কুমিল্লায় এক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখতেন। ২০১৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ভ্রাম্যমাণ আদালত কুমিল্লার ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে খোরশেদ আলমকে আটক করে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভুয়া চিকিৎসক হিসেবে তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।’
সুব্রত কুমার বিশ্বাস আরও বলেন, চিকিৎসাসেবার নামে এ ধরনের প্রতারণার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অমার্জনীয় অপরাধ। ভুয়া ওই চিকিৎসক ধরা পড়ার পর সব ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে বহিরাগত চিকিৎসকদের নাম-পরিচয়ের কাগজপত্র সিভিল সার্জন অফিসে জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।