রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় আট বছরের শিশুসন্তানের সামনে থেকে এক ব্যক্তিকে সন্ত্রাসীরা তুলে নিয়ে পরে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের চরবাগানবাড়ি এলাকার পদ্মার বালুচর থেকে ওই ব্যক্তির দ্বিখণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, পূর্ববিরোধের জের ধরে সন্ত্রাসীরা তাঁকে হত্যা করেছে। আজ বুধবার ওই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে গোয়ালন্দ ঘাট থানার পুলিশ।

নিহত ব্যক্তির নাম দেলোয়ার হোসেন ওরফে দিলু ব্যাপারী (৩০)। তিনি স্থানীয় চরদেলন্দি গ্রামের বেলায়েত ব্যাপারীর ছেলে।

পুলিশ জানায়, দেলোয়ারের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধঘোষিত সর্বহারা লাল পতাকার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ জানায়, গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নদীতে মাছ ধরার সময় সন্ত্রাসীরা দেলোয়ার হোসেনকে তুলে নিয়ে যায়। ওই সময় নৌকায় তাঁর শিশুপুত্রসহ আরও দুজন ছিলেন। আজ সকালে পুলিশ বালুচর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেলোয়ারের লাশ উদ্ধার করে। প্রায় ৫০ গজ দূরে তাঁর বিচ্ছিন্ন মাথা পড়ে ছিল। এর ২০ গজ দূরেই প্রায় ১২ ইঞ্চি লম্বা একটি চাকুর কাভার পাওয়া যায়। লাশের হাত-পা বাঁধা এবং দুই পায়ের রগ কাটা ছিল। তাঁর পিঠে ধারালো অস্ত্রের ছয়-সাতটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। বেলা ১১টার দিকে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আজাদ রহমানসহ পুলিশের দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

নিহত ব্যক্তির স্ত্রী আমিরুন নেছার ভাষ্য, প্রায় দুই মাস পর ঢাকা থেকে পয়লা বৈশাখের দিন বাড়িতে আসেন দেলোয়ার। দু-এক দিনের মধ্যে ফের ঢাকায় যাবেন বলে গতকাল বিকেলে ভায়রা আলাল কাজী ও শ্যালক আবদুর রহিমকে নিয়ে মাছ ধরতে বাড়ির কাছে পদ্মায় যান। এ সময় বাবার সঙ্গে মাছ ধরার বায়না ধরলে মেজ ছেলে শাকিলকে (৮) নিয়ে যান।

শাকিল স্থানীয় চরবেতকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। লাশ উদ্ধারের পর সকালে এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে উৎসুক মানুষের ভিড়। শাকিল আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে।

শিশু শাকিলের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে একজন জানান, ঘটনার রাতে নয়-দশজন লোক এসে দেলোয়ারকে নৌকায় করে তুলে নিয়ে যায়। সে সময় তিনি শাকিলের সঙ্গে বারবার কথা বলার চেষ্টা করেন। ওই সময় সন্ত্রাসীরা শাকিলকে ধমক দিয়ে বসিয়ে দেলোয়ারকে চরের দিকে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় শাকিলসহ অন্যদের সেখান থেকে চলে যেতে বলে সন্ত্রাসীরা। শাকিলের উদ্দেশে বলে, ‘তোর আব্বুকে আর ফিরে পাবি না।’

নৌকায় থাকা দেলোয়ারের শ্যালক আবদুর রহিম ও ভায়রা আলাল কাজীর তথ্যমতে, মুখোশপরা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা নৌকার কাছে ভিড়ে জানতে চায়, দিলু কে? দেলোয়ার নিজ থেকে পরিচয় দেওয়ার পর তারা তাঁকে নৌকা থেকে নামতে বলে। নামতে দেরি হওয়ায় গালাগালি করে দিলুকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নৌকা থেকে নামিয়ে পদ্মার চরের দিকে নিয়ে যায়। এ সময় নৌকায় থাকা দিলুর শিশুসন্তান বারবার বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তারা দেয়নি। একপর্যায়ে দেলোয়ার মুঠোফোনে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা তাঁর বাবাকে জানান।

দেলোয়ার ব্যাপারী বাবা বেলায়েত ব্যাপারী বলেন, ‘রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে দেলোয়ার মুঠোফোনে শুধু বলে, “আব্বা, ওরা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।” এর কিছুক্ষণ পর থেকে ওর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সারা রাত খোঁজ করার পর ভোরে নদী থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে চরবাগাবাড়ি এলাকায় পদ্মার চরে লাশ পাওয়া যায়।’

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মির্জা আবুল কালাম আজাদ। তিনি জানান, দেলোয়ারের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধঘোষিত সর্বহারা লাল পতাকার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ববিরোধের জের ধরে তাঁকে হত্যা করা হতে পারে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে লাশ উদ্ধার করে আজ দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।