অর্থ পাচার রোধে নীতিমালা হচ্ছে

আমদানি-রপ্তানির আড়ালে দেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের ঘটনায় বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অর্থ পাচার রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় এই ইউনিটের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে থাকা বাংলাদেশিদের টাকার খবর বের করতেও কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি। যদিও দেশটি ভারত সরকারকে তাদের ব্যাংকগুলোতে থাকা অর্থের তথ্য দিতে রাজি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রগুলো বলছে, বাণিজ্য অর্থায়নের মাধ্যমে দেশ থেকে কী কী উপায়ে টাকা পাচার হচ্ছে, তার কোনো সমীক্ষা বা গবেষণা নেই। ফলে কোনো নির্দেশনাও দিতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। আমদানি ঋণপত্র খোলার সময় ব্যাংকগুলো ওয়েবসাইট বা রয়টার্স সার্ভিস থেকে তথ্য নিয়ে থাকে। তবে মূলধনি যন্ত্রপাতির দাম দেশ ভিত্তিতে পরিবর্তন হওয়ায় গ্রাহকের চাহিদার ভিত্তিতেই ঋণপত্র খোলে ব্যাংকগুলো। এর মাধ্যমেই বড় অঙ্কের অর্থ পাচার হচ্ছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ জন্য আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বাংলাদেশ থেকে কী কী উপায়ে অর্থ পাচার হয়, তা জানতে কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. কবির আহাম্মদকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। কীভাবে অর্থ পাচার হয়, তা সমীক্ষা করে প্রতিরোধে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করবে এই কমিটি। এরপরই দেশ থেকে অর্থ পাচার রোধে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু হবে।

বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সালে প্রায় ৯১১ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি। আমদানি-রপ্তানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করার মাধ্যমেই এই অর্থের বড় অংশ পাচার করা হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই) অর্থ পাচারের এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

বিএফআইইউ প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাধারণত বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমেই অর্থ পাচার হয়ে থাকে। বাংলাদেশ থেকে কীভাবে অর্থ পাচার হয়ে থাকে, তা জানতে আমরা কাজ শুরু করেছি; এ জন্য গবেষণা চলছে। এরপরই অর্থ পাচার কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তার নীতিমালা করা হবে। এটা একটা জটিল কাজ। শেষ হতে আরও ছয়-সাত মাস লেগে যেতে পারে। নীতিমালা হলেই আমরা পুরো উদ্যমে কাজ শুরু করতে পারব।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিভাগ হিসেবে ২০০২ সালের জুনে যাত্রা শুরু করে বিএফআইইউ। এর নাম ছিল অ্যান্টি মানি লন্ডারিং বিভাগ। ২০১২ সালের ২৫ জানুয়ারি এই বিভাগকে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে রূপান্তর করা হয়। ২০১৩ সালে বিএফআইইউ আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রমের আন্তর্জাতিক সংগঠন এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়।

অর্থ পাচার কার্যক্রম জোরদার করতে বাংলাদেশ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ যুগোপযোগী করে। এই আইনে বলা হয়েছে, বিএফআইইউর প্রধান হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সমমর্যাদার। দেশীয়, বৈদেশিক, সরকার বা রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই বিএফআইইউ দায়িত্ব পালন করবে। অন্য সংস্থাকে দক্ষ জনবল নিতে বিএফআইইউ অনুরোধ করতে পারবে।

তবে এখন পর্যন্ত এই পদের প্রধান হিসেবে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অন্য ১৪টি বিভাগের পাশাপাশি বিএফআইইউও দেখভাল করেন। ফলে ইউনিটটির কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করতে পারেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এদিকে ২০১৫ সালের জুনে বিএফআইইউর পরিচালক প্রধান ও মহাব্যবস্থাপক হিসেবে সাবেক কর্মকর্তা দেবপ্রসাদ দেবনাথকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের সময় ওই বিভাগের কর্মকর্তাসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে আন্দোলনে নামলেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়নি। তিনি যোগদানের পর বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়। এতে অন্যরাও হয়ে যান  নিষ্ক্রিয়।

এ সময় বিএফআইইউর উপপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাণিজ্য অর্থায়নের মাধ্যমে কীভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে, তা বের করা বা প্রতিরোধ বিএফআইইউর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না। অন্য দেশের এফআইইউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার দক্ষ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত। বাংলাদেশেও এমন করা গেলে অর্থ পাচার কিছুটা রোধ করা যাবে।’

সূত্র বলছে, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। পরে এসব তথ্য পাঠানো হয় দুর্নীতি দমন কমিশনে। কারণ, আইন অনুযায়ী বিচারের দায়িত্ব দুদকের। তবে এরপর আর অগ্রগতি হতে দেখা যায় না।

বিএফআইইউর পরিদর্শনে বেরিয়ে আসা অর্থ পাচারের একটি প্রতিবেদন ২০১৫ সালে পাঠানো হয় দুদকে। এতে বলা হয়, দুবাইভিত্তিক কোম্পানি মোহসেন আল ব্রাইকি জেনারেল ট্রেডিংয়ের ৪৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশি নাগরিক আবুল আহসান চৌধুরী। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য আমদানির জন্য সোস্যাল ইসলামী, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ও ঢাকা ব্যাংকে ঋণপত্র খোলে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার রাসায়নিক পণ্য ও খাদ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফয়েজ উদ্দিন অ্যান্ড কোম্পানি। কিন্তু পণ্য আসেনি। অথচ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ২১৬ কোটি টাকা। পণ্য আমদানির নামে দুবাইয়ে অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অভিযোগ এলে আমরা খতিয়ে দেখি। দুদকের কাছে পাঠানো হয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে অর্থ পাচারের বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত দুদকে দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কোনোটার চূড়ান্ত কিছু হয়নি।’

রাজী হাসান বলেন, এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের সঙ্গে তথ্য বিনিময় চলছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিএফআইইউর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তাদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করা হবে, এ নিয়ে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ  বলেন, দেশে মূলত আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমেই বড় অর্থ পাচার হচ্ছে। এসব দেখভালের দায়িত্ব কাস্টমসের। তাদের অদক্ষতা বা দুর্নীতি-দুই কারণেই অর্থ পাচার হতে পারে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ বিষয়ে কাজ করবে বিএফআইইউ।