ময়ূরপঙ্খিতে চড়ে পালকিতে ফেরা, যেন রূপকথা

এ যাত্রায় তার নাম আছে। কয়েক দিন আগে খবরটা জানতে পেরে উত্তেজনায় খাওয়া-ঘুম প্রায় উবে গিয়েছিল। বড় আকারে শুধু টিভিতেই দেখেছে। এ ছাড়া আকাশে ছোট্ট পাখির আকারে শব্দ করে উড়ে যেতে দেখেছে। এখন সেটাই সামনাসামনি দেখতে পাবে! শুধু তা–ই নয়, তাতে চড়েও বসবে!

এমন সব ভাবনায় আজকের দিনটাকে স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছে সাথীর। পুরো নাম সাথী আক্তার। বয়স ১১ বছর। পড়ে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মনু মিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। চার ভাইবোনের মধ্যে সে তৃতীয়। অন্য সব শিশুর মতো আদর–আহ্লাদ জোটেনি তার কপালে। বাবা মারা যাওয়ার পর দরিদ্র মা তাকে চার বছর আগে রেখে গেছেন তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবারে। সেখানে অন্য সব অনাথ শিশুর সঙ্গে বড় হচ্ছে। উড়োজাহাজে চড়ার মতো আনন্দের ঘটনা তার এ বয়স পর্যন্ত কখনো ঘটেনি। সেই আনন্দ–বিস্ময় সে লুকাতেও পারছিল না। বিস্ময় তাকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পাল্টে ফেলতেও উৎসাহ জুগিয়েছে।

উড়োজাহাজে বসেই কথা হচ্ছিল সাথীর সঙ্গে। খুশিতে যেন ভাসছিল সে। বলল, ‘আগে আকাশে প্লেন উড়তে দেখেছি। আজ সেই প্লেনে চড়লাম। আগে ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হব। প্লেনে চড়ে সে ইচ্ছে বদলে ফেলেছি। এখন আমি পাইলট হব।’

সরকারি শিশু পরিবারের ৩০ জন শিশু নিয়ে ঢাকা-সিলেট পথে আজ শনিবার আকাশভ্রমণের আয়োজন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ছবি: প্রথম আলোবিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ‘ময়ূরপঙ্খি’ উড়োজাহাজে চড়ে আকাশে ভেসে সাথী যখন এসব বলছিল, তখন সঙ্গে ছিল তার মতোই সুবিধাবঞ্চিত ৩০ জন শিশু। তাদের মধ্যে ১৫ জন ছেলে, ১৫ জন মেয়ে। বয়স ১১​ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। ১৬২ আসনের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটিতে আজ তারা ছিল ‘বিশেষ কেউ’।

১৫ হাজার ফুট ওপর দিয়ে আজ শনিবার ভোর পাঁচটার দিকে ময়ূরপঙ্খি ঢাকা থেকে সিলেটের পথে উড়ে যায়। ওড়ার সময় সাথী আক্তাররা বারবার জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল আকাশের দিকে। ভেলার মতো ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘগুলোকে ছুঁয়ে ফেলতে চাইছিল বারবার। সাথীর মতো এই ৩০ জনের কারও বাবা নেই, কারও নেই মা। কারও বাবা-মা কেউ নেই। ছেলেশিশুদের ঠিকানা রাজধানীর মিরপুর সরকারি শিশু পরিবারে। আর মেয়েশিশুদের ঠিকানা তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবারে।

সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ‘স্বপ্ন যাদের আকাশছোঁয়া, বিমান তাদের অনুপ্রেরণা’ স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ আয়োজন করে আকাশভ্রমণের। ঢাকা থেকে সিলেট আসা-যাওয়া। পথে সিলেটের লাক্কাতুয়া চা–বাগান ও হজরত শাহ জালাল (রা.)-এর মাজার দর্শন।

উড়োজাহাজে চড়ে সাথীর মতোই অনুভূতি ছিল সহপাঠী তানজিলা, মেহেরুন্নেসা ও রনির। কখনো উড়োজাহাজ দেখতে পাবে, এটা ছিল তাদের কল্পনার বাইরে। যা দেখছিল, তা–ই ছিল তাদের কাছে নতুন কিছু। অন্য শিশুদের কাছে যা সাধারণ, তাদের কাছে সেটাও ছিল অসাধারণ। এ জন্য ফ্লাইটে পরিবেশন করা কেক, বার্গার, জুসও ছিল তাদের কাছে আকর্ষণীয়।

সাথীদের নিয়ে ময়ূরপঙ্খি ভোর সোয়া পাঁচটায় সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পাশে টিলার ওপর পর্যটনের অবকাশ কেন্দ্রে নাশতা শেষে দলটি রওনা দেয় আধা ঘণ্টা দূরত্বের লাক্কাতুয়া চা–বাগানে। ছিমছাম পরিবেশের চা–বাগান দেখেও মুগ্ধতা ছিল শিশুদের। ঘণ্টা খানেক সেখানেই ছোটাছুটি করেছে শিশুরা। চা–পাতায় হাত রেখে শিশু সাকিব হাসান (১১) অবাক। জানতে চাইল, এই পাতা থেকে কীভাবে চা হয়? সাকিব জানাল, চা–বাগানের কথা সে বই পড়ে জেনেছে। চার বছর আগে কোনো এক আত্মীয়ের মাধ্যমে মিরপুর শিশু পরিবারে তার ঠাঁই হয়। বাবা-মা কেউ নেই। মিরপুর সেনপাড়া পবর্তা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে সে।

মিরপুর শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক নাসিমা আক্তার বলেন, ‘আমিই এদের মা। এরা আমাকে আম্মা বলে ডাকে। আট-নয় দিন আগে বিমান কর্তৃপক্ষ এই আকাশভ্রমণের প্রস্তাব পাঠায়। এই আনন্দ ভ্রমণে সবচেয়ে কম বয়সী শিশুদের বাছাই করা হয়েছে।’ হেসে বললেন, ‘যাদের বাছাই করা হয়েছে, তারা গত কয়েক দিন উত্তেজনায় নাওয়া-খাওয়ার কথাই ভুলতে বসেছিল।’

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে এই ভ্রমণ প্রসঙ্গে বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ বলেন, ‘জন্ম থেকেই এই শিশুরা বঞ্চিত। সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুরা যে আদর পেয়ে থাকে, তার কিছুই এরা পায় না। তাই এদের মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য আমাদের চেষ্টা। এই ভ্রমণের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে এই স্মৃতি গেঁথে থাকবে। ভবিষ্যতে লেখাপড়ায় উন্নতি করতেও এ স্মৃতি তাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।’ তিনি জানান, এই শিশুদের যারা লেখাপড়ায় ভালো ফল করবে, তাদের জন্য বৃত্তি এবং শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেবে বিমান কর্তৃপক্ষ।

শাকিল মেরাজ আরও জানান, এই ভ্রমণে অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে পরে ঈদুল ফিতরের উপহারসামগ্রী বিতরণ করবেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম মোসাদ্দেক আহমেদ।

অর্ধবেলা ভ্রমণ শেষে এবার ঢাকায় ফেরার পালা। ফেরার উড়োজাহাজটি আরও বড়। সরাসরি লন্ডন-সিলেট রুটের ৪১৯ আসনের উড়োজাহাজটির নাম ‘পালকি’। এবার ‘পালকি’তে চড়তে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে সাথীরা। ১৫ জন মেয়েশিশুর পরনে গোলাপি রঙের সালোয়ার-কামিজ। ওপরে বিমানের স্লোগান লেখা টি-শার্ট। সবার চুল এক বেণি করে বাধা। ছেলেদের পরনেও একই রকমের টি-শার্ট। রূপকথার মতো এ যাত্রার স্বপ্নস্মৃতি নিয়ে তারা ফিরতে যাচ্ছে গৎবাঁধা নিয়মের বেড়াজালের জীবনে।