হোয়াইট হাউসে সিনেমা দেখবে আমজনতা?

ক্লোকরুম। টুপি, কোট, পার্সেল রেখে দেওয়ার জায়গা। রেলস্টেশন, থিয়েটারগুলোতে এই ক্লোকরুম বা কক্ষটি থাকে। হোয়াইট হাউসেও ক্লোকরুম আছে। প্রেসিডেন্টরা ব্যবহার করেন।

হোয়াইট হাউসের এ রকমই একটি কক্ষকে ১৯৪২ সালে সিনেমা হলে রূপান্তর করেন তখনকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। সেই থেকে প্রেসিডেন্টদের পরিবার, সহকর্মী, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন বা বিদেশি অতিথিরা ওই হলে বসে সিনেমা দেখে আসছেন। সাধারণ কারোর সেখানে ঢোকার সুযোগ নেই।

রোনাল্ড রিগ্যান সাবেক অভিনেতা হলেও সিনেমা খুব বেশি দেখতেন না। তিনি তাঁর জন্মদিনে এই হলে নিজের অভিনীত ছবিগুলোই দেখতেন। সঙ্গে থাকতেন স্ত্রী ন্যান্সিরোনাল্ড রিগ্যান সাবেক অভিনেতা হলেও সিনেমা খুব বেশি দেখতেন না। তিনি তাঁর জন্মদিনে এই হলে নিজের অভিনীত ছবিগুলোই দেখতেন। সঙ্গে থাকতেন স্ত্রী ন্যান্সিকিন্তু এত দিনে বর্তমান ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প সেই দুর্লভ সুযোগটি করে দিলেন। তাঁর নির্দেশ, এখন থেকে সাধারণেরাও এই সিনেমা হলে এসে ছবি দেখতে পারবেন। ফার্স্ট লেডির কল্যাণে মানুষ এখন সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থাপনা হোয়াইট হাউসে গিয়ে সিনেমা দেখার স্বাদ পাবেন। সেই সঙ্গে উপভোগ করতে পারবেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রটির প্রেসিডেন্টদের ব্যবহৃত কক্ষটির ঐতিহ্য।

মেলানিয়া বলেছেন, ‘হোয়াইট হাউস এই দেশের জনগণের। আমি বিশ্বাস করি, যাদের বেড়ানোর মতো সময় আছে এবং এখানে ঘুরতে আসেন তাঁদের সবার যতটা সম্ভব হোয়াইট হাউসের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও এর চমৎকার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার অধিকার আছে। আমি আশা করছি, আমাদের দর্শনার্থীরা সত্যিকার অর্থে হোয়াইট হাউসে ভ্রমণের সবচেয়ে নতুন অধ্যায়টি উপভোগ করবেন।’

ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প: যার কারণে এই হলে সাধারণ মানুষ ছবি দেখার সুযোগ পেতে যাচ্ছেফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প: যার কারণে এই হলে সাধারণ মানুষ ছবি দেখার সুযোগ পেতে যাচ্ছেশুধু দেশ শাসন বা বিশ্বব্যাপী ছড়ি ঘুরিয়ে মেয়াদ পার করেন না মার্কিন প্রেসিডেন্টরা। ফাঁক পেলেই তাঁরাও অন্য আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো বিনোদন জগতে ডুবে যান। অবসর সময় কাটান সিনেমা দেখে দেখে। পার্থক্য শুধু এটুকু, সাধারণেরা সিনেমা দেখেন হলে গিয়ে, আর মার্কিন প্রেসিডেন্টরা দেখেন সুরক্ষিত হোয়াইট হাউসে বসে। এখানে বসেই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রচুর সিনেমা দেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪ তম প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার।

বিখ্যাত ‘অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স মেন’ সিনেমাটি হোয়াইট হাউসের হলে বসেই দেখেছেন ৩৯ তম প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। ৩৭ তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনও এখানে ছবি দেখেছেন। তাঁর সবচেয়ে পছন্দ ছিল ‘ইয়াঙ্কি ডুডল ড্যান্ডি’ নামের সংগীত চলচ্চিত্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের অনেকে ছিলেন ‘সিনেমাখোর’। তাঁদের অন্যতম জিমি কার্টার ও আইজেনহাওয়ার। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন জিমি কার্টার। মাত্র এই চার বছরেই হোয়াইট হাউসে বসে তাঁর সিনেমা দেখার সংখ্যা ৪৮০ টি, যা অন্য যে কোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে সবচেয়ে বেশি। এমনও সপ্তাহ গেছে, দু-তিন রাত পার করেছেন সিনেমা দেখে। হোয়াইট হাউসে তাঁর দেখা প্রথম সিনেমা ছিল ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি নিয়ে নির্মিত ‘অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স মেন’। এই কেলেঙ্কারির কারণেই প্রেসিডেন্টের গদি খোয়াতে হয়েছিল রিপাবলিকান রিচার্ড নিক্সনকে।

কার্টারের পর সম্ভবত সিনেমা দেখায় সবচেয়ে বেশি অভ্যস্ত ছিলেন আইজেনহাওয়ার। তাঁর দেখা সেরা ছবির তালিকায় ছিল গ্যারি কুপার অভিনীত ছবিগুলো। এ ছাড়া তিনি প্রচুর পশ্চিমা সিনেমা দেখতেন। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন রোনাল্ড রিগ্যান। একজন সাবেক অভিনেতা হলেও সিনেমা দেখার নেশা তাঁকে পেয়ে বসেনি। তিনি তাঁর জন্মদিনে নিজের অভিনীত ছবিগুলোই দেখতেন। সঙ্গে থাকতেন তাঁর স্ত্রী ন্যান্সি। রিগ্যানই সিনেমা হলে রূপান্তরিত ক্লোকরুমকে পুনর্বিন্যাস করেছিলেন। আসন বাড়িয়ে করেছিলেন ৫১ টি।

আরেক রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশের পছন্দের তালিকায় ছিল গুপ্তচরভিত্তিক অস্টিন পাওয়ার্স সিরিজের ছবিগুলো। তবে যুদ্ধভিত্তিক ছবিও তাঁর পছন্দের তালিকায় ছিল। একদিকে তিনি বাস্তবে আফগানিস্তান, ইরাকে যুদ্ধ বাঁধিয়েছেন, অন্যদিকে পর্দার সামনে ডুবে ছিলেন ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’, ‘উই আর সোলজারস’ এর মতো ছবিগুলো দেখে দেখে।

সদ্যবিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ‘টু কিল এ মকিং বার্ড’ ছবিটি দেখেছেন হোয়াইট হাউসে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে জাতিগত সংঘাত নিয়ে নির্মিত এ ছবির ৫০ তম বার্ষিকীতে তিনি ছবিটি দেখেন।

বহুল আলোচিত নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পিছিয়ে নেই। জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণ করেই তিনি ‘ফাইন্ডিং ডোরি’ নামের ছবিটি দেখেন হোয়াইট হাউসের সিনেমা হলে। মা-বাবাকে খুঁজতে থাকা একটি মাছের গল্প নিয়ে অ্যানিমেশন এ ছবিটি তৈরি করা হয়েছে। মুসলিমপ্রধান সাতটি দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্বাহী আদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যখন তুমুল বিক্ষোভ চলছিল, ঠিক সেই সময়ে ছবিটি দেখেন ট্রাম্প।

হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইংয়ে অবস্থিত এ সিনেমা হল। এখানেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ৩২ তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট বোমা হামলা থেকে বাঁচতে যে আশ্রয়স্থল করেছিলেন সেটিও অবস্থিত।

এই সিনেমা হলে প্রথম প্রদর্শিত ছবিটির নাম ‘বার্থ অব এ নেশন’। গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে ১৯১৫ সালে নির্মিত এ ছবিটি কু ক্লাক্স ক্লান (কেকেকে) এর আন্দোলনকে মহিমান্বিত করার জন্য বহুল আলোচিত-সমালোচিত। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ ও শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা এবং অভিবাসী বিরোধিতার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল কেকেকে।