নববর্ষ ও বাংলার অর্থনীতি: একাল-সেকাল

274

 

 পহেলা বৈশাখ বাঙালিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। বাংলা বছরের প্রথম দিনটিকে বাঙালিরা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ হিসেবে পালন করে থাকে। এই নববর্ষ পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি প্রাণের উৎসব, যার সাথে জড়িয়ে আছে দেশীয় ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। বিশ্বের সকল প্রান্তের সকল বাঙালিরা পুরোনো বছরের দুঃখ, জরা, ক্লান্তি, গ্লানি ভুলে নতুনের প্রত্যাশায় নতুন সূর্যকে বরণ করে নেয় নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। সূচনা হয় একটি নতুন বছরের।

পহেলা বৈশাখ পালন আধুনিক যুগের অবদান নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস যা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। এর সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার অর্থনীতি ব্যবস্থা। প্রাচীনকালে অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র ছিল কৃষি এভং তা ছিল ঋতুধর্মী। কৃষির সকল কর্মকা- ছিল প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। তাই নববর্ষও ছিল একটি ঋতুধর্মী অনুষ্ঠান। কৃষির সুবিধার্থেই বাংলা সনের প্রবর্তণ করেন মোঘল স¤্রাট জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর। এর কারণ হিসেবে জানা যায় সেই সময় কৃষির খাজনা আদায় করা হতো হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে যা ছিল চন্দ্র পরিক্রমার উপর নির্ভরশীল। আর সেটি ছিল কৃষি ফলনের সাথে অসামঞ্জস্য। তাতে সঠিক সময়ে কৃষকেরা খাজনা প্রদানে ব্যর্থ হতো। দেখা যেত যখন খাজনা দিতে হতো তখন ফসল কাটা শুরুই হয়নি। ফলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতেই স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন যা সূর্যকেন্দ্রিয় এবং ঋতুর সামঞ্জস্যপূর্ণ। চন্দ্র কেন্দ্রিক তারিখ গণনার পরিবর্তে সূর্যকেন্দ্রিক ঋতুভিত্তিক তারিখ গণনার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা স¤্রাট আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল এর আকবর নামায় উল্লেখ আছে।

সম্রাট আকবরের আদেশে তৎকালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজী বাংলা বছর নির্ধারণ করেন। যা ১৫৮৪ সালের মার্চ ১০/১১ মাসে প্রবর্তিত হয় ফসলী সন হিসেবে। যদিও পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। সাধারণত বাংলা বছরের শেষ মাস অর্থাৎ চৈত্রের শেষ দিন ছিল কৃষকদের খাজনা প্রদানের শেষ দিন। জমিদার বা ভূমি মালিকদের খাজনা দিতে বাংলার কৃষকরা নানা রকম সমস্যায় পড়ত। বিশেষ করে সমস্যার মুখোমুখি হতো যাদের ফসলের অবস্থা খারাপ। কেননা, যেহেতু ফসল উৎপাদনে তারা পুরোপুরি প্রকৃতির উপর নির্ভর করত, সেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের ব্যাপক ফসলহানি ঘটতো। সে কারণে চৈত্রের শেষ দিনটি ছিল গরীব কৃষকদের জন্য অত্যন্ত হৃদয় বিদারক। খাজনা দিতে না পারা কৃষকরা নির্যাতনের মুখোমুখি হতো। এ কারণে এর পর দিন অর্থাৎ বৈশাখের প্রথম দিন বাংলার জমিদার ও ভূমির মালিকরা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টি মুখ করানো সহ নানান উৎসবের আয়োজন করতো। এর ফলে তারা সকল কিছু ভুলে নতুন করে শুরু করতো জীবন। এসব উৎসবে থাকত নাচ, গান, যাত্রাপালা, মেলা ইত্যাদি। এগুলো ক্রমান্বয়ে আজকের এই বৈশাখী উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।

কালের বিবর্তনে পহেলা বৈশাখের ধরনের নানা পরিবর্তন হয়েছে। পুরোনো উৎসব বিলুপ্ত হয়ে নতুন উৎসব স্থান দখল করেছে। তবে এর অন্তর্নিহিত বিষয় অর্থনীতি কেন্দ্রিকই রয়ে গেছে। যেমনÑ এক সময় বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে হালখাতা অনুষ্ঠান পালিত হতো। হালখাতা হলো এক ধরনের হিসাব-নিকাশের খাতা যা পুরোপুরি অর্থনীতি-কেন্দ্রিক। ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের শুরুতে পুরোনো সব হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে নতুন একটি খাতা খুলতেন। পুরোনো বছরের সকল পাওনা আদায় করে নতুন বছরে নতুন করে লেনদেন শুরু করতেন। আর এই হালখাতা উপলক্ষে ক্রেতাদের মিষ্টি খাওয়ানো সহ নানা ধরনের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা থাকতো কয়েকদিন ব্যাপী। বর্তমানে এই হালখাতা প্রথা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে এখনো গ্রাম-গঞ্জের বিভিন্ন দোকান বিশেষ করে স্বর্ণের দোকানে হালখাতা অনুষ্ঠান কিছুটা দেখতে পাওয়া যায়।

বর্তমানে শহর, গ্রাম সকল জায়গায় নববর্ষ-কেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের পরিবর্তন হয়েছে। এখন খাজনা আদায় পরবর্তী অনুষ্ঠান বা পাওনা আদায় অনুষ্ঠান হিসেবে বৈশাখী আয়োজন না হলেও নববর্ষ ব্যবসায়ীদের ব্যবসার নতুন একটি দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এখন সারা দেশ জুড়ে নববর্ষ উদ্যাপনের যে আয়োজন চলছে তাতে অর্থনীতি ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছে।

বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতি কৃষি ছাড়াও শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে এখন বিস্তৃত। বৈশাখ উপলক্ষে যে আয়োজন তাতে আমাদের পোশাক শিল্প, কারুপণ্য, লোক শিল্পজাত পণ্য ও মৃৎশিল্পকে এবং আমাদের দেশীয় খাদ্য উৎপাদন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল করে তুলেছে।

নববর্ষকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় নানা কর্মসূচী। যাতে অংশগ্রহণ করে হাজার হাজার মানুষ। নতুন বছরের নতুন সূর্যকে বরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণ সংগীত, মঙ্গল শোভাযাত্রা, গান, নাচ, কবিতা, যাত্রা সহ মেলায় অংশগ্রহণ করে নানান খেলার সামগ্রী যার পেছনে মানুষের কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে।

বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে থাকছে নানা আয়োজন। রেডিও, টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান, বিভিন্ন প্রদর্শনী ও মাসব্যাপী চলছে মেলা। এসবের মাধ্যমে একদিকে যেমন আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যকে আমরা ধরে রাখতে পারছি অন্যদিকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছি।

নববর্ষ আমাদের জীবনে নিয়ে আসে অপার সম্ভাবনা। নিজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ধরে রেখে নববর্ষ-কেন্দ্রিক ব্যবসা এগিয়ে নিতে পারে আমাদের অর্থনৈতিক গতিকে। কৃষির নির্ভরশীলতা কমিয়ে শিল্পের বিভিন্ন খাত যেমন মৃৎশিল্প, কুটিরশিল্প, কারুশিল্পের প্রসার ঘটিয়ে বিশে^র বুকে নিজেদের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে নববর্ষ হলো আমাদের প্রধান পদক্ষেপ। তার সাথে আমরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবো। দেশীয় পণ্য ব্যবহার করবো এবং দেশীয় সংস্কৃতি ধরে রাখবো। এ হচ্ছে নববর্ষের প্রার্থনা।