ধর্ম ব্যবসায়ীদের নতুন যড়ষন্ত্রের পথে বাংলাদেশ !

198

মানব জাতির বিশ্ব নেতা আমাদের প্রিয় নবীজি তার বিদায়ী হজ্বের ভাষনে স্পষ্ট করে বলেছেন, তোমরা কেউ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করিও না। তোমাদের পুর্বে অনেক জাতিই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়ে গেছে। অতএব, জাতি, বর্ণ, শ্রেণী, ধর্ম সবার আগে আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা আদম সন্তান, আমরা মানুষ, আমরা আশরাফুল মাখলুকাত। আমাদের জীবনের জন্য তৈরী হয়েছে ধর্ম। আমরা যে ধর্মেরই অনুসারী হই না কেন, আমাদের লক্ষ্য একমাত্র আমাদের সৃষ্টি কর্তাকে খুশি করা। আমরা মসজিদে নামাজ পরি আর হিন্দুরা মন্দিরে পুজা করে। আমাদের প্রার্থনার পদ্ধতি ভিন্ন, তবে লক্ষ কিন্তু একই।

বাংলা নববর্ষ পালনের নামে বৈশাখী মেলা করা হারাম উল্লেখ করে একজন ইমাম সাহেব বয়ান দিয়েছেন। তিনি তার বয়ানে উল্লেখ করেছেন, লাল শালু কাপড় পড়ে কোনো মুসলমান মেলায় যেতে পারে না। তিনি বলেছেন, বাংলা নববর্ষ নাকি হিন্দুদের উৎসব, মুসলমাদের নয়। আমি তার ওই বয়ানের বিরুদ্ধে ফেসবুকে একটি স্ট্যাস্টাস দিয়েছিলাম। তার পর পরেই আমার বিরুদ্ধে বেশ কিছু ব্যক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমার ওই স্ট্যাস্টাসের বিরোধীতা শুরু করেন। আমার পক্ষে অবস্থানের সংখ্যা ছিলো দুই-এক জন। এতে আমি লজ্জিত হইনি। তবে মনে ধারণা তৈরী হয়েছে, (১) আমরা স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও ধর্ম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বের হতে পারিনি। অসম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ স্বাধীন হলেও এখনো আমরা মৌলবাদের কাছে জিম্মি আছি। পাকিস্তানী কিছু নব্য এজেন্ট আমাদের দেশে এখনো জন্ম নিচ্ছে। (২) আমার ফেসবুকে কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী ও তার অনুসারী বন্ধু হয়ে আছেন। হে আল্লাহ, তুমি আমাকে ধর্ম ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রক্ষা কর।

যাই হোক আমার কিছু প্রশ্ন, বাংলা নববর্ষ চালু করেছেন মোঘল স¤্রাট আকবর। তিনি জমির খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য আরবী সালের আদলে বাংলা নববর্ষের সুচনা করেন। বাদশা আকবর একজন মুসলিম বাদশা ছিলেন আর তখন থেকেই বাংলা নববর্ষের সুত্রপাত। অতএব আমরা বলতে পারি বাংলা নববর্ষ কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে যখন বাঙ্গালী সাংস্কৃতিকে পাকিস্তানী গোষ্ঠী হানা দিতে শুরু করেন তখন তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানে ছায়ানট প্রতিবাদ হিসাবে বাংলা নববর্ষ উৎসব চালু করেন। আমরা এবার বলতে পারি, এটি বাঙ্গালী জাতির উৎসব বা প্রতিবাদ কর্মসুচী। আর সব উৎসবের সাথে ধর্মের সর্ম্পক বের করাও ঠিক নয়। যারা বাংলা নববর্ষ উৎসবের বিরোধীতা করছেন তারা মুলত পর্দার আড়াল থেকে পাকিস্তানী গোষ্ঠীর সেই অপচেষ্টা নতুন করে শুরু করেছেন বলে আমি মনে করি। “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- এটিকে যারা মানতে পারছে না তারাই আজ নববর্ষ উৎসবের বিরোধীতা করছেন। আর হ্যা, লাল শালু কাপড়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোরআনের কোথাও কি বলা আছে ? লাল শালু কাপড় পড়া যাবে না। যারা আমার প্রাণের জাতীয় সংগীত গাওয়া বা বাংলা নববর্ষের বিরোধীতা করছেন তাদের বলবো কোরআনের কোথায় উল্লেখ আছে জাতীয় সংগীত গাওয়া যাবে না বা বাংলা নববর্ষ উৎসব করা যাবে না ? আমি মাওলানা সাহেবদের বলছি, যদি নববর্ষ উৎসব আপনাদের ভাষায় হারাম হয়, তাহলে তো শহীদ মিনারে ফুল দেয়া বা লাশের উপরে বা মাজারে ফুল দেয়া হারাম।

একটি জাতির নিজস্ব কিছু উৎসব থাকতেই পারে তারা তাদের নিয়মে সেই উৎসব পালন করবেন, সেখানে ধর্ম আসবে কেনো ? জাতীয় সংগীত গাওয়া, নববর্ষ উৎসব, বসন্ত উৎসব বা অন্য কোনো উৎসবে আমরা কোনো ধর্মকে ছোট করছি কিনা তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। আমরা যে ধর্মের মানুষই হই না কেন, মানুষের জন্যেই তো ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের যদি কোনো অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে ধর্ম কে পালন করবেন ? তাই আমাদের উচিত মানুষের মঙ্গলে ধর্মের ব্যবহার করা। ধর্ম যার যার, উৎসব হোক সবার। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কখনোই মঙ্গল হয় না তা আমরা আমাদের নবীজির বিদায়ী হজ্বের ভাষণ থেকেই বুঝতে পেয়েছি। তবে আমার ভয় হচ্ছে, যারা নববর্ষের বিরোধীতা করে বয়ান দিচ্ছেন, তারা কখন যে বলে উঠবে, শহীদ মিনারেও ফুল দেয়া হারাম !

পরিশেষে শুধু বলবো, সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মানুষের মানবিক ও সমাজিক গঠনে বিভিন্ন উৎসব পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীন চিন্তার প্রসারেও এর ভূমিকা অসীম। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সম্প্রতি মতলববাজরা ধর্মকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা গড়ে তুলেছে। ইসলাম প্রচারের নামে অর্থ গ্রহন হারাম জেনেও সমাজে কিছু মাওলানা আছেন, যারা ইসলাম প্রচারের নামে ব্যবসা খুলে বসেছেন। তারা ইসলাম প্রচার করে অর্থ উপার্জন করছেন। ওই সব ধর্ম ব্যবসায়ীদের নতুন যড়ষন্ত্রের পথে জাতির জনক ও বঙ্গবন্ধু’র স্বপ্নের আমার প্রিয় বাংলাদেশ। তাই এদের প্রতিরোধ করতে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক:- আসাদুজ্জামান সাজু