অপহরণের আইনি প্রতিকার

175

বাংলায় অপহরণ অথবা ইংলিশে কিডন্যাপিং। অপহরণ শব্দের সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত।পত্রিকা খুললেই অমুক জায়গায় শিশু অপহরণ,তমুক জায়গায় কিশোর/কিশোরী অপহরণ।বেশিরভাগ অপহরণের পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য থাকে মুক্তিপণ দাবী।

আইন মতে অপহরণের সংজ্ঞা-

সাধারণভাবে অপহরণ হলো কোন ব্যক্তিকে জোর করে ধরে একস্থান থেকে অন্যস্থানেতুলে নিয়ে যাওয়া। দন্ডবিধির ৩৬১ ধারায় অপহরণের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে,১৪ বছরের কমবয়স্ক পুরুষ বা ১৬ বছরের কম বয়স্ক নারী বা কোনঅপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তিকে আইনানুগ অভিভাবকের তত্ত্বাবধান থেকে অনুমতি ছাড়া বা প্রলুব্ধ করে কোন ব্যক্তি কর্তৃক নিয়ে যাওয়াকে সেই ব্যক্তির আইনানুগ অভিভাবকের কাছ থেকে অপহরণ করে বলে গণ্য হবে। ৩৬২ ধারায় বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে কোন স্থান হতে গমন করার জন্য জোরপূর্বক বাধ্য করে বা কোন প্রতারণামূলক উপায়ে প্রলুব্ধ করে, সেই ব্যক্তি উক্ত ব্যক্তিকে অপহরণ করে বলে গণ্য হবে।

সাধারণত যারা অপহরণের শিকার হয়-

সাধারণত শিশুরাই বেশি অপহরণের শিকার হয় তবে যে কোন বয়সের মানুষই অপহরণের শিকার হতে পারে।

আইনের চোখে অপহরণের সাজা-

অপহরণের পর অপরাধীরা অপহৃত ব্যক্তির পরিবারকে জিম্মি করে নানারকম স্বার্থসিদ্ধি করার অপচেষ্টা চালায়। আইনের চোখে ‘মনুষ্য-হরণ’ ও ‘অপহরণ’ ফৌজদারি অপরাধ এবং এদের সাজাও বেশ কঠোর।দ-বিধির ৩৫৯ নাম্বার ধারায় মনুষ্য-হরণ এবং ৩৬২ নাম্বার ধারায় ‘অপহরণ’ সংক্রান্ত বিধান বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখ্য, ইংরেজি ‘কিডন্যাপিং’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘মনুষ্য-হরণ’ এবং ‘অ্যাবডাকশন’শব্দের প্রতিশব্দ ‘অপহরণ’ করাহয়েছে। দ-বিধির ৩৫৯ ধারা অনুসারে উক্ত ‘মনুষ্য-হরণ’ দুই প্রকারের। প্রথমত, বাংলাদেশ থেকে মনুষ্য-হরণ, দ্বিতীয়ত, আইনানুগ অভিভাবকত্ব থেকে মনুষ্য-হরণ। দ- বিধির ৩৬০ নাম্বার ধারা অনুসারে যে ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকেউক্তব্যক্তি বা উক্ত ব্যক্তির পক্ষে সম্মতি দানের জন্য আইনত ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়াই বাংলাদেশ সীমানার বাইরে বহন করে নিয়ে যায়, সেই ব্যক্তিউক্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশ থেকে অপহরণ করে বলে গণ্যকরাহবে। দ-বিধির ৩৬১ নাম্বার ধারা অনুসারে, যে ব্যক্তি পুরুষের ক্ষেত্রে১৪ বছরের কমবয়স্ক বা নারীর ক্ষেত্রে ১৬ বছরের কম বয়স্ক কোনো নাবালক বা কোনো অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির আইনানুগ অভিভাবকের তত্ত্বাবধান থেকে অনুরূপ অভিভাবকের সম্মতি ছাড়াই নিয়ে যায় বা প্রলুব্ধ করে নিয়ে যায়, সেই ব্যক্তি অনুরূপ নাবালক বা অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তিকে আইনের দৃষ্টিতে অপহরণ করে বলে গণ্য হবে।

তবে উপরিউক্ত ধারাটির কিছু ব্যাখ্যা ও ব্যতিক্রমও জানা প্রয়োজন। এই ধারায় ‘আইনানুগ অভিভাবক’ শব্দাবলিতে অনুরূপ নাবালক বা অন্য কোনো ব্যক্তির আইনানুগ তত্ত্বাবধান রক্ষণাবেক্ষণের ভারপ্রাপ্ত যে কোনো ব্যক্তিকে বোঝাবে। এক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমও রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়াই কোনো শিশুর বা কোনো নাবালককে আইনানুগ অভিভাবক হিসেবে বিশ্বাস করে তবে তার ক্ষেত্রে এই ধারাটি প্রযোজ্য হবে না। আবার ৩৬২ নাম্বার ধারায় অপহরণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, কোনো জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কেউ যদি শক্তি প্রয়োগ করে কাউকে বাধ্য করে কিংবা প্রতারণামূলক উপায়ে প্ররোচিত করে, তখনঅপহরণেরঅপরাধ সংঘটিতহবে। মনুষ্য-হরণ ও অপহরণের উদ্দেশ্য এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে দন্ডবিধির ৩৬৩, ৩৬৪, ৩৬৫, ৩৬৬ থেকে ৩৬৯ নাম্বার ধারায় শাস্তির বিধান বর্ণিত হয়েছে। যেমন- ৩৬৩ ধারা অনুসারে মনুষ্য-হরণের সাজা ৭ বছরের কারাদন্ড কিংবা অর্থদণ্ড সহ কারাদন্ড। আবার হত্যার উদ্দেশ্যে কিংবা বেআইনিভাবে আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ কিংবা মনুষ্য-হরণ করা হলে ৩৬৪ ও ৩৬৫ নাম্বার ধারা অনুসারে তার সাজা ১০ বছরের কারাদন্ড কিংবা তৎসহ অর্থদন্ড।৩৬৬ নাম্বার ধারার বিধান অনুসারে কোনো নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে বা যৌনসংগম করার উদ্দেশ্যে অপহরণ করা হলে তার শাস্তি ১০ বছর কারাদণ্ড জরিমানাসহ।

কেউ অপহৃত হলে কি করবেন-

অপহরণের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে আপনার নিকটস্থ থানাতে গিয়ে বিষয়টি জানান। বিষয়টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এজাহার হিসাবে গণ্য করলে তিনি ঘটনাটি প্রাথমিক তথ্য বিবরনী ফরম বা F.I.R ফরমে লিপিবদ্ধ করবেন এবং এটি নথিভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট এখতিয়ার সম্পন্ন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে প্রেরন করবেন। মামলাটি সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারাধীন ম্যাজিষ্ট্রেট আমলে গ্রহন করলে, উক্ত মামলার আসামীদেরকে আদালতের সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য একটি তারিখ ধার্য করবেন এবং পরবর্তীতে মামলাটি বিচারের জন্য উপযুক্ত আদালত তথা ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করবেন। যদি কোন কারনে এজাহার দায়ের করতে বিলম্ব হয়ে যায় তবে বিলম্ব হওয়ার কারন থানাকে অবহিত করুন।

আদালতে মামলা দায়েরের মাধ্যমে প্রতিকারঃ যদি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অপরাধটি গ্রহন করতে সম্মত না হন তাহলে থানায় যে কারনে মামলাটি গ্রহন করা হয়নি সেই কারন থানা কর্তৃক নির্দিষ্ট ফরমে লিপিবদ্ধ করে নিয়ে কিংবা সরাসরি আরজি দাখিলের মাধ্যমে।

পরিশেষে বলা যায়,অপরাধপ্রবণ মানসিকতা থেকে বের হওয়া,আইনের কঠিন প্রয়োগ তদুপরি আমাদের সচেতনতাই পারে অপহরণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটন এবং আসন্ন বিপদ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে।

লেখকঃ জান্নাতুল ফেরদৌস অদিতি

আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।