কালজয়ী দার্শনিক ও সাহিত্যিক: বার্ট্রান্ড রাসেল

786

বার্ট্রান্ড রাসেল একটি প্রত্যয়ের নাম। বিশ্বদর্শন ও বিশ্বসাহিত্যের আকাশে যে কয়জন মহামনীষীর নাম জ্বল জ্বল করে জ্বলছে বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁদের অন্যতম। ভাববাদী ধারার পরিবর্তে পৃথিবীটাকে যারা কর্মযজ্ঞে পরিণত করতে চেয়েছিলেন রাসেল ছিলেন তাঁদের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ। জ্ঞানের প্রতি ছিল তাঁর সুগভীর অনুরাগ। ক্ষণকালের মাঝে তিনি ধারণ করেছিলেন মহাকালের চিন্তাধারা। তাঁর বৈশ^য়িক চিন্তাধারা ছিল সম্পূর্ণ বাস্তবধর্মী। বাস্তবতার আলোকে তিনি ধারণ করেছিলেন মহাকালকে।

১৮৭২ সালের ১৮ই মে ইংল্যান্ডের লর্ড পরিবারে এই মহামনীষী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পারিবারিক নাম বার্ট্রান্ড আর্থার উইলিয়াম রাসেল। রাসেলের পিতা ভাইকাউন্ট অ্যাম্বারলি ছিলেন উদারনৈতিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁর মাতার নাম ক্যাথরিন অ্যাম্বারলি। পিতা মাতার দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন রাসেল। মাতা ক্যাথরিন অ্যাম্বারলি ১৮৭৪ সালে ডিপথেরিয়ায় মারা যান। এর ১৮ মাস পরে (১৮৭৬ সালে) পিতা ভাইকাউন্ট অ্যাম্বারলিও মারা যান। মাত্র তিন বছর বয়সে মাকে এবং তার ১৮ মাস পরে বাবাকে হারিয়ে রাসেল নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। বড় ভাই ফ্রাঙ্কের সাহচর্য থেকেও তিনি ছিলেন অনেকটা বঞ্চিত। এ সময় মাতামহী লেডী জন রাসেল শিশু রাসেলের লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দাদী ছিলেন রাজনীতিতে উদারনৈতিক, ধর্মীয় চিন্তায় কঠোর নীতিবাদী। এই মহীয়সী নারী রাসেলের জীবনে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। দাদা ছিলেন রাণী ভিক্টোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী।

ছোটকাল থেকেই রাসেল ভাবুক ও চিন্তাশীল প্রকৃতির ছিলেন। মনে হয় শৈশবে পিতা-মাতাকে হারিয়ে এবং বড় ভাই ফ্রাঙ্কের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হয়ে তিনি ভাবুক প্রকৃতির হয়ে পড়েন। তাছাড়া জীবন ও জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করার প্রবল আকাক্সক্ষা তাঁর মধ্যে প্রথম থেকেই দেখা যায়।

১৮৯০ সালে তিনি কেমব্রিজের ট্রিনটি কলেজে ভর্তি হন। অল্পদিনেই অনন্য ছাত্র হিসেবে পরিচিতি পান। ১৮৯৩ সালে অঙ্কশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীর বিরল সম্মান অর্জন করে ট্রিনটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দু’বছর প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করেন এবং সমাজবাদী মার্ক্সবাদী অর্থনীতির উপর পড়াশুনা করেন। ট্রিনটি কলেজ থেকে ‘অহ ঊংংধু ড়হ ঃযব ঋড়ঁহফধঃরড়হ ড়ভ এবড়সবঃৎু’ রচনার জন্য ফেলোশিপ অর্জন করেন। জীবনে তিনি চারটি বিয়ে করেন। তাঁর সহধর্মিনীগণ প্রত্যেকেই তাঁকে লেখার কাজে সাহায্য করতেন। রাসেল তিন সন্তানের জনক ছিলেন।

বিংশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন প্রধাণত বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী মানুষ। তাঁর জীবনে জ্ঞানের অন্বেষণ সুবিদিত।

ঊনিশ আর বিশ শতকের ইউরোপের ফসল রাসেল ছিলেন প্রগাঢ় ও জটিল চিন্তা জগতের বাসিন্দা। ভিক্টোরিয়া যুগের প্রশান্তি থেকে শুরু করে দু দুটো বিশ্ব, রাশিয়া আর চীনের বিপ্লব, অন্ধকার আফ্রিকা আর এশিয়ার দেশে দেশে স্বাধীনতার সূর্যোদয়, ভিয়েতনামের প্রবল প্রতিরোধ,   সব কিছু ছিল তাঁর অভিজ্ঞতায় বিধৃত।

আগেই বলেছি অতি অল্প বয়সেই রাসেলের মনে দার্শনিক জ্ঞান তথা সত্য লাভের আগ্রহ জন্মে এবং সত্য লাভের জন্য যে সংশয় পদ্ধতি অপরিহার্য তা তিনি উপলব্ধি করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে কোনো দার্শনিক গ্রন্থ পাঠ না করেই তিনি দর্শন চিন্তা আরম্ভ করেন। জগৎ-জীবন সম্পর্কে একদিকে যেমন তিনি নির্মাণ করেছেন প্রগাঢ় দার্শনিক তত্ত্ব অন্যদিকে তেমনি রচনা করেছেন অতি উচ্চমানের সাহিত্য। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মে বিচিত্র সামাজিক সমস্যাগুলোকে সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

রাসেলের জ্ঞান সাধনার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁর মত পরিবর্তন করেছেন, কোনো একটি মত বা পথকে ভুল জেনে তাকে আকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা তিনি কখনো করেননি। কুসংস্কারের বেদৗমূলে তিনি কখনও আবদ্ধ ছিলেন না, ছিলেন পরিবর্তনশীলতায় বিশ্বাসী। আর এর মূলে কাজ করেছে তাঁর স্বচ্ছ চিন্তা, সংশয়ী, বিশ্লেষণাত্মক ও প্রগতিশীল মন।

জগৎ-জীবনের মৌলিক বিষয় নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর সুবিশাল সাহিত্য ভান্ডার। রাসেলের মূল পরিচয় দার্শনিক হলেও সাহিত্য জগতে তাঁর অবদান কোনো অংশে কম নয়। ১৯৫০ সালে সাহিত্যেই তিনি নোবেল পুরষ্কার পান। তাঁর কালজয়ী রচনা ‘ম্যারেজ এ্যান্ড মরালস (১৯২৯)’ গ্রন্থের জন্যই তিনি নোবেল পুরষ্কার পান। এছাড়া রাসেলের ছোটগল্প, বড়গল্পও এক অসাধারণ সৃষ্টিকর্ম। কবিতা নিয়েও তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি চীন, ভারতের কবিতা সম্পর্কেও ‘ম্যারেজ এ্যান্ড মরালস’ গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। মধ্যযুগের কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “এখানে একটা বিষয় আমাদের অবাক করে দেয় তা হলো মধ্যযুগের আগেও ভালোবাসার কবিতা লেখা হয়েছে কিন্তু তাকে প্রেমের প্রত্যক্ষ অংশীদার করা হয়নি।” সেই সময় ভারতীয় কাব্যে রহস্যময়তার যে প্রকাশ ছিলো তা নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। সেই সময় ভারতীয় কাব্যে নারীকে আত্মরূপে দেখানো হয়েছে যে কিনা ঈশ্বর পুরুষের জন্য কাতর।

কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেছেন: “হৃদয়ের পরম আকাক্সিক্ষত বস্তুটি লাভ না করলে জন্ম নেয় না মহান কবিতা।” কবিতা সাহিত্যের একটি বিরাট অংশ হলেও কিছু কবিতা সুসাহিত্যের অন্তরায় সৃষ্টি করে। এই ধরনের কবিতাকে তিনি সমালোচনা করেছেন কঠোরভাবে। কবি শেলী সম্পর্কে তিনি বলেছেন “… … … তাঁর বিচার বুদ্ধি মন্দ মনস্তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।” বাসনার পথে একাধিক বাধা শেলীকে কবিতা লিখতে উজ্জীবিত করে। শেলী কর্তৃক বিবৃত বিচিত্র ভালোবাসার অনুভূতির মধ্যে অস্থির মানসিকতার প্রকাশ দেখা যায় বলে রাসেল মন্তব্য করেন।

রাসেল ছিলেন প্রেমিক পুরুষ তাঁর হৃদয়ে একদিকে ছিল বিশ্বপ্রেম যা তাঁর মহান মানবতার পরিচয় বহন করে অন্যদিকে ছিল ব্যক্তিপ্রেম। তিনি জীবনে বারবার প্রেমে পড়েছেন। জীবনে বিয়ে করেছেন চারবার। ব্যক্তিজীবনে রাসেল সুখী ছিলেন। নারী জাতির স্বাধীনতার প্রতি তিনি ছিলেন সর্বদা সোচ্চার। নারী জাতির প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা। ভালোবাসা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “ভালোবাসাকে ভয় করার অর্থ হলো জীবনকে ভয় করা এবং যারা জীবনকে ভয় করে তারা জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকে।” ‘দি কনকোয়েষ্ট অব হ্যাপিনেস’ গ্রন্থেও তিনি সৎ ভালোবাসার কথা বলেছেন।

পৃথিবীতে উচ্চমানের সাহিত্য হল দর্শন সমৃদ্ধ সাহিত্য। আর দর্শন সমৃদ্ধ সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ হলেন বার্ট্রান্ড রাসেল। তাঁর বিপুল-বিশাল সাহিত্য কর্মের মধ্যে ‘ম্যারেজ এ্যান্ড মরালস (১৯২৯)’, ‘দ্যা কনকোয়েষ্ট অব হ্যাপিসেন (১৯৩০)’, ‘নিউ হোপস ফর এ চেনজিং ওয়ার্ল্ড, ‘অন এডুকেশন (১৯২৬)’, ‘এডুকেশন এ্যান্ড দ্যা সোশাল অর্ডার (১৯৩২)’। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্যা অটোবায়োগ্রাফি’, ‘পোট্রেটস ফ্রম মেমোরি (১৯৫৬)’, ‘হোয়াই আই অ্যাম নট এ ক্রিশচিয়ান’। এসব গ্রন্থগুলোতেও তিনি অপূর্ব সৃজনশীল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।

মহামতি রাসেল দর্শনের ক্ষেত্রেও রচনা করেছেন জগতের সাড়া জাগানো গ্রন্থগুলো ‘মাই ফিলোসফিক্যাল ডেভেলপমেন্ট’, ‘অ্যাঁন ইনকোয়ারি ইনটু মিটিং অ্যান্ড ট্রুথ (১৯৪০)’, ‘হিউম্যান নলেজ: ইটস স্কোপ অ্যান্ড লিমিটস’, ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তবে দর্শনের ক্ষেত্রে তাঁর ‘হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি (১৯৪৫)’ গ্রন্থটি বেষ্ট সেলার গ্রন্থ। এই গ্রন্থ থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি অর্থ আয় করেন। দর্শন ছাড়া বিজ্ঞান বিষয়েও তিনি কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেনÑ ‘দ্যা এ বি সি অব রিলেটিভ (১৯৫২)’, ‘দ্যা সায়েনটিফিক আউটলুক (১৯৫২)’, ‘রিলিজিয়ন এন্ড সায়েন্স (১৯৩২)’ এবং ‘দ্যা ইমপ্যাক্ট অব সায়েন্স অন সোসাইটি (১৯৫২)’ গ্রন্থগুলো উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১৯৫৭ সালে ইউনেস্কো থেকে কলিঙ্গ পুরষ্কার পেয়েছেন। এছাড়াও তিনি অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। একমাত্র বার্ট্রান্ড রাসেলের পক্ষেই সম্ভব এত বিশাল-বিপুল গ্রন্থ রচনা করা। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকাতে উল্লেখ আছে জীবনের এক পর্যায়ে তিনি প্রতিদিন তিন হাজার শব্দ লিখতেন। গ্রন্থকার অ্যালান উড রাসেলের জীবনকালে তাঁর সৃষ্টির বিপুলতার উল্লেখ করে বলেছেন, রাসেল এত বিচিত্র ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন যে তাঁর সৃষ্টির সঠিক পর্যালোচনায় প্রয়োজনীয় জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি একমাত্র রাসেল ব্যতীত দ্বিতীয় কেউ আছেন বলে আমি মনে করিনা।

মানবতাবাদী এই দার্শনিক রাজপথে মিছিল-মিটিং করেছেন। প্রচার করেছেন বিশ্ব প্রেমের বাণী। প্রেম বা ভালোবাসা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে রাসেল বলেছেন, “সত্যিকার প্রেম শত্রুমিত্র ভেদাভেদ ভুলে একটি সার্বজনীন রূপ লাভ করে। তাই সংকীর্ণ ভালোবাসার গ-ি পার হতে পারলে দেখতে পাওয়া যায় যে প্রেমের রাজ্য মিলনের রাজ্য, প্রেমের রাজ্য সৌহার্দের রাজ্য। সেখানে বিভেদ নেই, বিভক্তি নেই, আছে শুধু মমতা ও একত্ববোধ।”

প্রেম-ভালোবাসা, পরিবার থেকে শুরু করে কৃষি, সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, শিল্পকলা, চিত্রকলা, ধর্মতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, রাষ্ট্রতত্ত্ব, উৎপাদন, শিল্পায়ন, জনসংখ্যাতত্ত্ব, পৃথিবীর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, বিবর্তন প্রভৃতির ক্ষেত্রে তিনি এক বৈশ^য়িক চিন্তার সুস্পষ্ট স্ফুরণ ঘটিয়েছেন তাঁর সাহিত্যকর্মে। বলাবাহুল্য এমন বস্তুনিষ্ট লেখক বিশ^ ইতিহাসে বিরল।

তাঁর সাহিত্য কর্মের মধ্যে যৌন জীবন ও নৈতিক জীবন সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা পাওয়া যায়। সুস্থ সুন্দর জীবনের জন্য যৌন শিক্ষা অপরিহার্য বলে তিনি স্কুল-কলেজের সিলেবাসে যৌন শিক্ষা অন্তর্ভূক্ত করার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন। পাশ্চাত্যের খারাপ দিকগুলোর প্রভাব কিভাবে প্রাচ্যের অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে সে সম্পর্কে তিনি ছিলেন উদ্বিগ্ন। অনুন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের জন্য তিনি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধিরোধ করার দু’টো উপায় আছে। একটা হচ্ছে মৃত্যুর হার বাড়িয়ে, অন্যটা জন্মহার কমিয়ে। তিনি দ্বিতীয়টি সমর্থন করেছেন।

তাঁর সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন এবং বিরাট অংশ জুড়ে আছে মানবতাবাদ এবং বিশ্বশান্তিবাদ। মানবতার ক্ষেত্রে তিনি বিবেককে জাগ্রত করার কথা বলেছেন। মানব প্রেম ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তাঁর ভাষায় “আজকের দিনে ব্যাপক ধ্বংস তাই এই ধ্বংসকারী মনোভাবের উপর বিবেকের নিয়ন্ত্রণ অত্যাবশ্যক।

আধুনিক বিশ্বের অন্যায় ও অত্যাচারকে তিনি কখনো মেনে নিতে পারেননি। রাসেলের সবচাইতে বড় কামনা ছিল বিশ্বশান্তি। তাই তিনি সব সময় সকল যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন। যুদ্ধকে তিনি সব সময় মানব সমাজের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলনও করেছেন। প্রথম বিশ^যুদ্ধের বিরোধীতা করার জন্য তাকে অনেক দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। তিনি তাঁর ট্রিনটি কলেজের চাকরি হারিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাকে আমেরিকা যেতে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করেন। শান্তিবাদ প্রচারের জন্য ১৯১৮ সালে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। কারাভোগ কালে তিনি ‘অহ ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় ঃযব গধঃযবসধঃরপধষ চযরষড়ংড়ঢ়যু’ নামে একটি গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেন।

পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে পারমানবিক অস্ত্রসজ্জার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় ৯০ বছর বয়সে আবার কারারুদ্ধ হন। তিনি সব সময় অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের স্বপ্ন দেখেছেন, বন্ধ করতে চেয়েছেন আনবিক যুদ্ধের বিভীষিকা। এজন্য গঠন করেছিলেন “রাসেল শান্তি ফাউন্ডেশন”। যুদ্ধের জন্য দায়ী মার্কিন সরকার এবং যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে তিনি যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গণ্য করেছেন এবং তাদের বিচারের জন্য গঠন করেছিলেন “আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল”। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বিশে^ স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন।

এই জ্ঞানতাপস মনীষী ১৯৭০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ৯৮ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। পশ্চাতে রেখে যান শতাব্দীর অন্যায়-অবিচার, কুশাসন, কুসংস্কার ও অযৌক্তিকতার বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম ও জীবন দর্শনের অমূল্য গ্রন্থরাজি।

পৃথিবীর বুকে মানব সভ্যতা যতদিন টিকে থাকবে ততদিন রাসেল তাঁর আপন প্রতিভায় আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আবদুল মতীন যথার্থই বলেছেন, “… … … বার্ট্রান্ড রাসেলের মত প্রতিভা ও সৃষ্টির বহুমুখীতা নজীরবিহীন”। জন্ম বার্ষিকীতে এই মহান মনীষীর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।