ইসলামী ফ্রন্টের নেতা ফারুকী হত্যা রহস্যের জট খুলেছে

182

ঘটনার চার বছরের মাথায় জট খুলেছে টেলিভিশন উপস্থাপক ও ইসলামী ফ্রন্টের নেতা মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যা রহস্যের। কেন, কারা, কী কারণে তাকে হত্যা করেছে তা বের হয়ে এলো দুর্ধর্ষ জঙ্গি হাদিসুর রহমান সাগরের দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মধ্য দিয়ে। গত ৩০ মে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে ওই জবানবন্দি দেয় সাগর। এই প্রথম ফারুকী হত্যার দায় স্বীকার করল কোনো জঙ্গি।

এরপর তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশের বিশেষ অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডি। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ফারুকী হত্যা মিশনে জেএমবির দুটি অংশ সম্মিলিতভাবে অংশ নিয়েছিল। হত্যা মিশনের এখন পর্যন্ত ৯ জন সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। আর কিলিং মিশনের মূল কমান্ডার ছিল আনোয়ার হোসেন ফারুক ওরফে জামাই ফারুক। হত্যার আগে আশুলিয়ায় বৈঠক করে চূড়ান্ত হয় ফারুকী হত্যার ছক। প্রায় ডিপফ্রিজে চলে যাওয়া একটি চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত হঠাৎ করে আলোর মুখ দেখায় নিহতের পরিবার খুশি। তারা চান দ্রুত এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হোক। সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র গতকাল রোববার সাংবাদিকদেরকে এসব তথ্য জানায়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ফারুকী হত্যায় সাগরসহ কয়েকজন জেএমবি সদস্যের জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। সাগর এ মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। হত্যায় জড়িত আরও কয়েকজনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এ মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে চার্জশিট দাখিলের মতো একটি শক্ত ভিত্তি হাতে এলো।

নিহতের ছেলে আহমেদ রেজা ফারুকী বলেন, জানতে পেরেছি এ মামলার তদন্তে অগ্রগতি রয়েছে। একজন হত্যার কথা স্বীকারও করেছে। দ্রুত তদন্ত শেষে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করা হোক- এটাই আমাদের চাওয়া।

২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট রাতে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের ১৭৪ নম্বর বাসায় মাওলানা ফারুকীকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা মামলাটি পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়। ডিবির তদন্তে কোনো ফল না আসায় মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সাগর স্বীকার করেছে ফারুকী হত্যায় জেএমবির ভেতর ও বাইরের দুটি গ্রুপ অংশ নেয়। সাধারণত কারাবন্দি মাওলানা সাঈদুর রহমানের গ্রুপকে জেএমবি ভেতরের গ্রুপ বলে অভিহিত করত। আর আবদুর রহমান ওরফে সারওয়ার জাহান মানিক ও ডা. নজরুল ইসলামের গ্রুপ বাইরের গ্রুপ বলে পরিচিত। ফারুকী হত্যাকাণ্ডের আগের দিন ২০১৪ সালের ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় আশুলিয়ায় একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের পাশে জেএমবির ভেতর ও বাইরের দুই গ্রুপ একত্রিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিল মানিক, জামাই ফারুক, সাগর, আবদুল্লাহ আল তাসনীম ওরফে নাহিদ, আশফাকসহ অন্তত ৯ জন। মূলত দুই গ্রুপ সমঝোতার জন্য একত্রিত হয়েছিল সেখানে। মানিক ও নজরুল গ্রুপের সদস্য হিসেবে সাগর ঘটনার দিন আব্দুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়ার বৈঠকে যায়। তবে সমঝোতা আলোচনার বাইরে ওই বৈঠকে ফারুকীকে হত্যার ব্যাপারে আলোচনা হয়। জঙ্গিদের মধ্যে কয়েকজন সেখানে তাদের ভাষায় ব্যাখ্যা দেয়-‘ফারুকী কোরআন, হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। একইভাবে আল্লাহ ও নবীকে নিয়ে অপব্যাখ্যা দেন তিনি।’ তারপর ফারুকীকে হত্যার ছক চূড়ান্ত করে তারা। পরদিন তার ফার্মগেটের বাসায় চলে যেতে বলা হয় সকলকে।

জানা গেছে, ফারুকীর হত্যা মিশনের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল জেএমবির ঢাকা অঞ্চলের আমির ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাসনীম। তবে মূল অপারেশনের কমান্ডার করা হয় জেএমবির দুর্ধর্ষ সদস্য জামাই ফারুককে। গত বছর সে ভারতে গ্রেফতার হয়। ফারুকী হত্যা ছাড়াও ২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ হত্যা করে ত্রিশালে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিল ফারুক। দীর্ঘ দিন ভারতে পলাতক ছিল সে। তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ভারত। আর ২০১৪ সালের শেষের দিকে পুলিশ তাসনীমকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে সে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে। তখন জানা যায়, জেএমবির ‘জ্ঞাতসারেই’ ফারুকীকে হত্যা করা হয়। তবে কারা জড়িত ছিল তা বের করা যাচ্ছিল না তখন। আর মানিক সাভারে র‌্যাবের একটি অপারেশনে নিহত হয়। এছাড়া হত্যায় জড়িত আশফাক নামে আরেকজন কারাগারে রয়েছে। তবে ফারুকী হত্যায় সরাসরি জড়িত এমন চার জঙ্গি এখনও গ্রেফতারের বাইরে। তাদের বিস্তারিত নাম-পরিচয় তদন্তের এই পর্যায়ে জানতে রাজি হয়নি সূত্রটি। আগামী ৩ অক্টোবর ফারুকী হত্যা মামলায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য রয়েছে।

তদন্ত সূত্র জানায়, ফারুকী হত্যার পর থেকেই ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের দিকে সন্দেহের তীর ছিল স্বজন ও তদন্ত-সংশ্নিষ্টদের। বিভিন্ন সময়ে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি) ও আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের (এবিটি) কয়েক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তারা কেউ সরাসরি হত্যায় জড়িত ছিল না। তাদের ভাষ্য, টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ফারুকীর ধর্মীয় বক্তব্যের কারণে মানুষ মাজার ও শিরকের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল। মূলত এ কারণেই হত্যা করা হয় তাকে।

মামলাটি সিআইডিতে পাঠানোর আগ পর্যন্ত তদন্ত করেন ডিবির পরিদর্শক জুলহাস উদ্দিন আকন্দ। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর সন্দেহভাজন অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সন্দেহের তালিকায় থাকা অনেক মোবাইল নম্বরের কললিস্ট পর্যালোচনা করা হয়েছে, তবে তদন্ত-সহায়ক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্নিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ফারুকী হত্যাকাণ্ডের পর শায়খ মোজাফফর বিন মুহসিনসহ এবিটির তিনজন, জেএমবির ছয়জন ও হুজিবির তিন সদস্যসহ ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

এর মধ্যে জেএমবির ছয়জনসহ ১২ জন এখনও কারাগারে।এদিকে মাওলানা ফারুকী হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩ অক্টোবর নতুন তারিখ ধার্য করেছেন আদালত। গত ১৪ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিআইডি সেদিন প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন দিন ধার্য করেন আদালত।