সিরিয়ার আরবিন শহরে বড়দিনের আনন্দ নেই

42

বড়দিন চলে আসছে। নাবিল আল-আশ চার্চে ধর্মীয় বই থেকে ধুলো ঝাড়ছেন। তিনি সিরিয়ার যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহর আরবিনের সেন্ট জর্জ চার্চটি পরিষ্কার করছেন।
শহরটি রাজধানী দামেস্ক থেকে উত্তরপূর্বে অবস্থিত।
বসন্তকালে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুগত বাহিনী শহরটি পুনরুদ্ধার করেছে। ইস্টার্ন ঘোউতায় বিদ্রোহীদের ঘাঁটি দখলের সময় বাশার বাহিনীর অভিযানে আরবিন প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। তাই শহরবাসীর উৎসব করার মতো অবস্থা নেই।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
ভবনগুলোর ধ্বংসস্তুপ রাস্তায় পুড়ে যাওয়া যানবাহন ও ইস্পাতের জঞ্জালের সাথে পড়ে আছে। শহরটিতে বড়দিন উপলক্ষ্যে কোন ধরনের উৎসবের ছোঁয়া লাগেনি। এর চেয়ে ধ্বংসযজ্ঞই চোখে পড়ছে বেশি।
শহরের একমাত্র চার্চ সেন্ট জর্জের পুড়ে যাওয়া দেয়াল বিগত সাত বছরের গৃহযুদ্ধের চিত্রই তুলে ধরছে। এই রক্তক্ষয়ী ভয়াবহ সংঘাতে ৩ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে ও আরো লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে।
আশ বলেন, ‘আমাদের এখানে বড়দিন উপলক্ষে কোন উৎসব নেই, আনন্দ নেই। যুদ্ধে খ্রিষ্টানদের বাড়িঘর ও চার্চগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।’
তিনি আরো বলেন, ১৮৭৩ সালে নির্মিত গ্রিক অর্থাডক্স চার্চটির সংস্কার করতে ‘প্রচুর সময়, অর্থ ও প্রচেষ্টা’ লাগবে।
২০১২ সালে শহরটিতে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে আশ(৫৫) পালিয়ে যান। দামেস্ক শহরটিকে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং এখানে কয়েক বছর ধরে সহিংসতা চলে।
কিন্তু সরকারি বাহিনী এলাকাটি পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিলে তিনি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
আশ আরো বলেন, ‘আমি চার্চেই বড় হয়েছি। আমি আমার জীবনের সবগুলো বড়দিন এখানে কাটিয়েছি। এক সময় এখানে বড়দিন এলে আনন্দের জোয়ারে ভেসে যেত।’
তিনি বলেন, ‘চার্চের এই অবস্থা দেখে আমি মারাই যাচ্ছিলাম প্রায়।’
তার মতে, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত স্থানীয়রা ফিরে না আসবেন উৎসবের আমেজও ফিরবে না।’
এপ্রিল মাসে রাশিয়ার বিমান বাহিনীর সহায়তায় সরকারি বাহিনী ইস্টার্ন ঘোউতাকে পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নেয়।
আরবিন শহরের মেয়র খলিল তোহমি জানান, শহরটিতে প্রায় ৩ হাজার খ্রিষ্টান বাস করতেন।
কিন্তু রাজধানী ও এর আশাপাশের এলাকাগুলোতে আত্মীয়রা ফিলে এলেও আরবিনের বাসিন্দারা এখনো বাড়ি ফিরতে ইতস্তত করছেন।
আশ বলেন, ‘এখন আমরা মাত্র পাঁচ জন খ্রিষ্টান নিয়মিত শহরে আসছি। অন্যান্যরা মাঝে মধ্যে শহরে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। অধিকাংশেরই বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে।’
চার্চ থেকে কয়েক মিটার দূরে জোসেফ হাকিমেহ একজন শ্রমিককে দিয়ে বাড়ির দেয়াল রঙ করাচ্ছেন। তিনি বাড়িটি মেরামত করেছেন।
এই ঠিকাদার বাড়িটি মেরামত করে মালিককে বুঝিয়ে দেবেন। তিনি নিজের বাড়ি ছাড়াও আরো তিনটি বাড়ি সংস্কারের কাজ হাতে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফিরে আসার জন্য অবকাঠামো মেরামত করছি। তবে এতে কিছুটা সময় লাগবে।’
রঙের একটি ক্যানে বসে ৩৯ বছর বয়সী ঠিকাদার কথা বলছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আগামী বছরের মধ্যে সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে বলে আমি আশা করছি। আবার আগের মতো ক্রিসমাস গাছ সাজানো হবে। গির্জায় প্রার্থনা হবে।’
দামেস্কের পূর্বাঞ্চলীয় কাসার ক্রিষ্টান অধ্যুষিত এলাকার বাড়িগুলো বড়দিন উপলক্ষ্যে বাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও সবার মাঝে উৎসবের আমেজ নেই।
রিয়াদ রাজিহার পরিবারের সদস্যরা ২০১২ সালে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু তারা উৎসব করার মতো মানসিক অবস্থায় নেই।
৬৬ বছর বয়সী রিয়াদ রাজিয়াহ বলেন, ‘আমাদের শিকড় এখানে। আমাদের স্মৃতি এখানে।’
তিনি তার নাতি-নাতনিদের সাথে আরবিনে বড়দিন উৎসব পালনের স্বপ্ন দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি আরবিনে জন্মেছি। আমি আরবিনে থাকতাম। আমি সেখানেই মরতে চাই। সেখানেই সমাহিত হতে চাই।’