কিডনি রোগের চিকিৎসায় স্টেম সেলের ভূমিকা কী?

43

স্টেম সেল শরীরের একটি আদি কোষ। সাধারণত আমরা জন্ম নেওয়ার পর একটি কোষ থেকে সব কোষ তৈরি হয়। সেই আদি কোষকে আমরা ব্যবহার করে নতুন যেকোনো ধরনের কোষ তৈরি করতে পারি। এটি স্টেম সেল।

স্টেম সেল পদ্ধতির মাধ্যমে কিডনির চিকিৎসার প্রেক্ষাপটের বিষয়ে এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ৩২৯৮তম পর্বে কথা বলেছেন অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ। বর্তমানে তিনি বিআরবি হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত।

প্রশ্ন : স্টেম সেল কী?

উত্তর : বায়োলজিক্যাল বিজ্ঞানী যারা, তাদের জন্য স্টেম সেলটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন যত গবেষণা হচ্ছে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে, সেখানে দেখা যায় সবচেয়ে বড় বাজেট হলো স্টেম সেলের ওপরে।

আমরা জানি, যখন একটা প্রাণী বা একটি মানুষ তৈরি হচ্ছে, সেটা কিন্তু প্রথম একটি কোষ থেকে আসে। মায়ের থেকে ওভাম আর বাবার থেকে আসে শুক্রাণু বা স্পার্ম। এই দুটো মিলে একটি নিষিক্ত ডিম হয়। সেটা একটি থেকে দুটো, দুটো থেকে চার, চারের থেকে আট, বিভাজন হয়ে হয়ে একটি মরলা তৈরি হয়। সেটা থেকে দেখা যায় একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হচ্ছে।

এখন আমি যদি একটি মানুষের লিভার থেকে একটি টুকরো কেটে দেখি মাইক্রোস্কোপে, তার যে চেহারা, আর কিডনির থেকে যদি কেটে দেখি, চেহারাটা দেখব সম্পূর্ণ ভিন্ন, কাজও ভিন্ন। তেমনিভাবে হার্ট, কিডনি প্রত্যেকটি অঙ্গের গঠন ভিন্ন ভিন্ন। ভিন্ন ভিন্ন তার কাজও। কিন্তু তারা এসেছে মাত্র একটি কোষ থেকে। তো যে কোষটি থেকে এই প্রত্যেকটি অঙ্গ আলাদা আলাদাভাবে তৈরি হয়েছে, সেই প্রাথমিক কোষকে বলা হয় স্টেম সেল। গাছের যেমন গোড়া থাকে, সেখান থেকে যেমন অসংখ্য শাখা প্রশাখা জন্মায় তেমনি শুরুতে থাকে স্টেম সেল। সেই একটি কোষ থেকে আমাদের দেহে যত রকম অঙ্গ রয়েছে, সেগুলো তৈরি হচ্ছে। শুরুতে যে একটি কোষ ছিল, এটি স্টেম সেল।

বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে কেন এত উৎসাহী? তারা উৎসাহী এই কারণে যে এ রকম একটি কোষকে বাইরে থেকে যদি আমরা পরিবেশ দিতে পারি, যে পরিবেশে এসে সে একটি থেকে দুটো, দুটো থেকে চারটি কোষে বিভাজিত হতে পারে, তাহলে অনেক কিছু সম্ভব। একে যদি কোনো উদ্দীপনা বা স্টিমুলেশন দিয়ে এমন করতে পারি এগুলো থেকে যে কোষ তৈরি হবে, সেগুলো দেখতে ঠিক কিডনির মতো, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়তো করা যাবে। আবার একেও যদি উদ্দীপিত করতে পারি, হয়তো মস্তিষ্কের কোনো একটি জায়গা ক্ষয় হয়ে গেছে, ঠিক সেই রকম কোষগুলো তৈরি করবে অথবা লিভার ডেমেজ হয়ে গেছে, লিভারের মতো কোষ তৈরি করবে।  ধরুন, স্ট্রোক হয়ে মস্তিষ্কের অংশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে বলে সম্পূর্ণ প্যারালাইস হয়ে যায়। স্টেম সেল থেকে সেই রকম কোষ যদি তৈরি করে সেখানে দিয়ে দিতে পারি, তাহলে এটা ঠিক হয়ে যেতে পারে।

একগুচ্ছ কোষ মাত্র, এখানে কোনো গ্রন্থি নেই, নালী নেই, তাহলে এটিতো তৈরি করা সবচেয়ে সহজ। এ ধরনের কোষ যদি আমরা তৈরি করতে পারি, এটা যদি চামড়ার নিচে আমরা কেবল রেখে দিতে পারি, সেলাই দিয়ে আমরা প্রতিস্থাপন করে দিলাম, তাহলে এখান থেকে ইনসুলিন তৈরি হয়ে উপকার হবে। বাংলাদেশে যে এক লাখ ৮০ হাজার লোক ডায়াবেটিসে ভুগছে, সবাই ভালো হয়ে যেত। এদের ভোগান্তি আর থাকত না। সেই জন্যই বিশ্বব্যাপী স্টেম সেল নিয়ে এত উদ্দীপনা, এত গবেষণা চলছে।

প্রশ্ন : এখন কথা হলো যেকোনো পর্যায়ে এই গবেষণাটা রয়েছে?  বাংলাদেশে এর অবস্থা কেমন? কিডনি রোগের ক্ষেত্রে এটি যে প্রয়োগ হচ্ছে,এর অবস্থা কেমন?

উত্তর : ক্রনিক কিডনি ডিজিজ যাদের, যারা ডায়ালাইসিসের রোগী, তাদের এটি করা যেতে পারে। আমরা দেখতাম চেম্বারে অংসখ্য মানুষ আসত, রোগী দেখানোর জন্য নয়, তারা জানতে আসত। জিজ্ঞেস করত, আমাদের রোগীর তো ডায়ালাইসিস চলছে, আমরা শুনেছি, স্টেম সেল দিয়ে না কি কিডনি ভালো করা যায়, তাহলে আপনারা কী বলেন? একটু মতামত নিতে আসে। ১৭ তারিখ কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের একটি সেমিনারও হয়েছে। বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে সেটি আয়োজন করা হয়েছে। স্টেম সেলের মাধ্যমে কিডনি ভালো করার যে বিষয়টি- আমরা চেষ্টা করছি, বড় বড় গবেষণা দেখার জন্য এবং তারা কত দূর এগিয়েছে সেটি দেখছি। সেই সঙ্গে গত নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু সারাবিশ্ব থেকে প্রায় ১৪ হাজার ন্যাফ্রোলজিস্ট যোগ দিয়েছিল। নতুন নতুন যে উদ্ভাবন হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে বলা হয়েছে। স্টেম সেল নিয়ে সেখানে উপস্থাপনা ছিল। তারা যেটি দেখিয়েছে ওই দেশে, স্টেম সেল তারা বাইরে নিয়ে কালচার করেছে ওজন ল্যাবে। ওজন ল্যাব মানে এমন একটি ল্যাব থাকবে, যেখানে কোনো জীবাণু যেতে পারবে না। সম্প্রতি এক দশমিক আট মিলিয়ন ডলার দিয়েছে শুধু হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়কে স্টেম সেল তৈরি করে বাইরে কালচার করে দেখবে যে তার অ্যাকশন বা রিঅ্যাকশনগুলো কতটুকু হয়, সেই গবেষণা করার জন্য। আর যারা কিডনি কোষ নিয়ে কাজ করছে, তারা কালচার করে দেখেছে যে কিডনির মতো কিছু যে কোষগুলো কিডনিতে রয়েছে, সেগুলো কালচার করে, সেগুলো আবার সরাসরি, কিডনির যে নালী রয়েছে, রেনাল আর্টারিতে সরাসরি ইনজেক্ট করে দিয়েছে যাতে বাইরে কোথাও নষ্ট না হয়। দিয়ে এরপর তারা দেখেছে যে কিডনির যে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোনোটার ডায়ালাইসিস যে হচ্ছে, তাদের দিলে কতটুকু সুবিধা হয়।

তারা দেওয়ার পর কিছু সময় নিয়েছে, কিডনিকে তারা আবার বায়োপসি করেছে, কেটে আবার দেখেছে যে কী হয়েছে। তারা দেখেছে যে কিছু কোষ গিয়ে কোনো কোনো জায়গায় থোকা থোকা জমে আছে। বিশেষ করে যে আবরণ রয়েছে, তার নিচে। কিনডির আকার তো অত্যন্ত জটিল। যদি ২৪ লাখ নেফ্রোন থাকে, একটি নেফ্রোনের একটি অংশ থাকে গ্লুমারুলস। এখানে অসংখ্য রক্তের জালি থাকে। এখানে মেকানিজম খুব জটিল। সেটা হতে পারেনি এখন পর্যন্ত।

কিন্তু যেটি আমরা সেদিন সেমিনার থেকে জানতে পারলাম এবং কিছু লিফলেটও দেখলাম যে যাদের ডায়ালাইসিস হচ্ছে, তাদের কিডনি তারা ভালো করে ফেলছে। এটা যে কতটা বাস্তবসম্মত তারাই হয়তো সেটি দেখাতে পারবে এবং দেখালে অবশ্যই তারা নোভেল পুরষ্কার পাবে।

তবে একটি ইনডিভিজুয়াল এভিডিয়েন্স দিয়ে কখনো সেটি হবে না। ধরুন, যদি কিডনি ফেইলিউরের কথা বলি, হঠাৎ করে কোনো কিডনি ফেইলিউর হলো বা কোনো ওষুধের কারণে সমস্যা হলো, সেই ক্ষেত্রে দেখা যায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে ভালো হয়ে যায়। একে একিউট বলে। আবার যদি দেখা যায় যে সে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছে, যে ছাকনিগুলোর কথা বললাম, সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং সেগুলো তুলার আঁশের মতো কিছু বিষয় দিয়ে সেগুলো প্রতিস্থাপন হচ্ছে, তাদের যদি বলা হয় যে তার পাঁচ ভাগ কাজ করছে, তাহলে কিন্তু বাকি সব ভাগ কাজ করছে না। ৯৫ ভাগ কিন্তু বিকল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু রয়েছে, তাদের ৫০ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে, ৫০ ভাগ রয়েছে এখনো, ক্রিয়েটিনিন হয়তো দুই চলে আসছে। কিন্তু হঠাৎ করে তার ডায়রিয়া হলো, বমি হলো, হঠাৎ করে তার ক্রিয়েটিনিন আট বা নয়- এ চলে গেল। তাকে প্রয়োজনবোধে ডায়ালাইসিস দিতে হবে। কিন্তু পাঁচ থেকে সাতটা ডায়ালাইসের পর কিন্তু ওই যে তার কিডনি কাজ করছে, সেই অবস্থায় আবার চলে যেতে পারে। একিউট ও ক্রনিককে স্টেম সেল দিলে কিন্তু সে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ভালো হয়ে যাবে। এটি হয়তো ঝড়ে বক মারার মতো হতে পারে।

প্রশ্ন : যারা এই বিভ্রান্তিতে পড়ছেন সেসব রোগীর প্রতি আপনার পরামর্শ কী থাকবে?

উত্তর : তাদের জন্য এটি বলব, বিশ্বের যত উন্নত দেশ রয়েছে, তাদের গবেষণায় এখনো প্রমাণিত হয়নি যে স্টেম সেল দিয়ে তাৎক্ষণিক ভালো করা যায়। কাজেই যেখানে আমরা যুক্তরাষ্ট্র বা উন্নত দেশগুলোকে অনুসরণ করছি, তো সেখানে যদি হঠাৎ করে কেউ বলে যে এ রকম ভালো করে ফেলছি, তাহলে তাদের অনেকবার খতিয়ে দেখতে হবে।

স্টেম সেল নিঃসন্দেহে একটি অভিনব আবিষ্কার। তবে এর বর্তমান অবস্থা জেনে বুঝে আমাদের অভিজ্ঞদের কাছে যেতে হবে।

যাদের ক্রনিক ফেইলিউর তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা দিয়ে কিডনি ভালো হয়ে গেছে এমন প্রমাণ কোথাও নেই।
সুত্র: এনটিভি